খলিফা হয়ে হযরত আবু বকর (রা.)-এর প্রথম ভাষণ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলমানদের নেতা কে হবেন—এটা নিয়ে আলোচনার জন্য সাহাবিরা সাকীফায়ে বনী সায়িদায় একত্রিত হন। আলোচনার এক পর্যায়ে আবু বকর (রা.) খলিফা হিসেবে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ও আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু তারা দুজনই খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং আবু বকর (রা.)-কে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন।

আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.) আবু বকর (রা.)-কে বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরে মুসলমানদের মধ্যে কারো জন্যই আপনার ওপর স্থান পাওয়া সমীচীন নয়। আপনি সেই ব্যক্তি, যিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে হিজরতের সময় সাওর গুহায় ছিলেন। কোরআনে আপনাকে ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন অসুস্থ হলেন, তখন তিনি আপনাকেই ইমামতি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং আপনি নামাজের ইমামতি করেছিলেন। সুতরাং এই দায়িত্বে আপনার হকই সবচেয়ে বেশি।”

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সমবেত সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা কি জানেন না যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজের জন্য আবু বকর (রা.)-কে সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন? তাহলে আমাদের মধ্যে কে এমন আছে যার মন সায় দেয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, সে তার চেয়েও সামনে এগিয়ে যাবে?”

এভাবে সাহাবায়ে কেরাম একমত হন যে, আবু বকর (রা.)-কেই খলিফা হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে তাঁকে খলিফা নির্ধারণ করে না গেলেও নামাজের ইমামতি করার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

ওমর (রা.) প্রথমে আবু বকর (রা.)-কে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর হাতে বায়াত হন (অর্থাৎ তাঁর আনুগত্যের শপথ করেন)। তারপর একে একে উল্লেখযোগ্য সাহাবায়ে কেরাম এবং মদিনার সাধারণ মুসলমানরা আবু বকর (রা.)-এর হাতে বায়াত হন।

সাকীফায়ে বনী সায়িদায় হযরত আবু বকর (রা.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণের পর পরের দিন সকালে লোকজন সমবেত হলে হযরত আবু বকর (রা.) মিম্বরে বসলেন। তখন আবু বকরের পূর্বে হযরত ওমর (রা.) দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করে তিনি বললেনঃ
“হে জনমণ্ডলী! আমি আপনাদেরকে গতকাল কিছু কথা বলেছি। যা বলেছি তা আল্লাহর কিতাবে আমি পাইনি। রাসূলুল্লাহ (সা.)-ও এ ব্যাপারে আমাকে কোনো নির্দেশনা দেননি। বরং আমার ধারণা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন। তিনিই হবেন আমাদের সর্বশেষ ব্যক্তি। আর আল্লাহ তায়ালা আপনাদের মাঝে সেই ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, যার নিকট রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ বিদ্যমান রয়েছে। যদি আপনারা তাঁকে আঁকড়ে থাকেন, তাহলে আল্লাহ তায়ালা আপনাদেরও সেই হিদায়াত দান করবেন, যে হিদায়াত তিনি তাঁকে দান করেছেন। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সর্বোত্তম ব্যক্তির নেতৃত্বকে বরণ করার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী, সাওর গুহায় তাঁর একমাত্র সঙ্গী। সুতরাং সবাই তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণে এগিয়ে আসুন”!

এভাবে সাকীফার বায়াতের পরে সর্বসাধারণ জনগণ হযরত আবু বকর (রা.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন।

এরপর হযরত আবু বকর (রা.) দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করে নিম্নরূপ ভাষণটি দেনঃ
“হে জনমণ্ডলী! আমি আপনাদের নেতা নির্বাচিত হয়েছি। তবে আমি আপনাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। আমি যদি ভালো কাজ করি, আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন। আর যদি আমি অন্যায় কাজ করি, আপনারা আমাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবেন। সততা আমানত আর মিথ্যা খিয়ানত। আপনাদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তি আমার নিকট শক্তিশালী, যতক্ষণ না তার অধিকার আমি আদায় করিয়ে দিতে পারি—ইনশাআল্লাহ। আর আপনাদের মধ্যে শক্তিমান ব্যক্তি আমার নিকট দুর্বল, যতক্ষণ না তার থেকে আমি হকদারের অধিকার ফিরিয়ে এনে দিতে পারি—ইনশাআল্লাহ। যে জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ করা পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত-অপমানিত করেন। যে জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ব্যাপক হয়, সে জাতির ওপর আল্লাহ ব্যাপকভাবে বালা-মুসিবত নাজিল করেন। যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য করি, ততক্ষণ আপনারা আমার আনুগত্য করবেন। আর যদি আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অবাধ্য হই, তাহলে আমার আনুগত্য করতে আপনারা বাধ্য নন। এখন আপনারা সালাতের জন্য উঠে পড়ুন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি সদয় হোন।”