খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল (৬৩২ -৬৬১) (পর্ব-২)

**এখানে খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল চারটি পর্বে তুলে ধরা হবে। পুরো লেখাটা ভালো ভাবে বুঝতে গত পর্ব দেখার অনুরোধ রইল**

হযরত উমর (রা.)

হযরত আবু বকর (রা.) যখন বুঝতে পারেন যে তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে, তখন তিনি পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে যাওয়া ভালো মনে করলেন। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর তিনি হযরত উমর (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করেন। এরপর তিনি সাহাবিদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। অধিকাংশ সাহাবীই এ প্রস্তাবে সম্মতি দেন অবশেষে সবাই একমত হন এবং হযরত উমর (রা.)-কে পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনীত করা হয়।

হযরত আবু বকর (রা.)-এর ইন্তিকালের পর হযরত উমর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ইসলামী খেলাফতের ইতিহাসে প্রথম “আমিরুল মুমিনিন” উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর শাসনামলে ইসলামিক সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় পূর্বে পারস্য থেকে পশ্চিমে মিশর পর্যন্ত। তাঁর আমলে দামেস্ক, বায়তুল মোকাদ্দাস (জেরুজালেম), ইরান ও ইরাক জয় করা হয়। ঐতিহাসিক কাদিসিয়া ও ইয়ারমুক যুদ্ধও তাঁর শাসনামলে সংঘটিত হয়। তাঁর সুবিচার, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দৃঢ় নেতৃত্বের জন্য তাঁকে “অর্ধ পৃথিবীর খলীফা” বলা হত।

কিন্তু এই মহান শাসক শেষ পর্যন্ত এক কষ্টদায়ক ঘটনার শিকার হন। একদিন মুগীরা ইবনে শু’বা (রা.)-এর এক দাস আবু লুলু তার মনিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে হযরত উমর (রা.)-এর কাছে আসে। তিনি অভিযোগ শুনে ন্যায়বিচার করেন, কিন্তু আবু লুলু সেই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে হযরত উমর (রা.)-এর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

পরদিন ফজরের নামাজের সময় মসজিদে নববীতে আবু লুলু একটি বিষাক্ত ছুরি নিয়ে আসে। যখন জামাত শুরু হয় এবং হযরত উমর (রা.) ইমামতি করছিলেন, তখন সে অগ্রসর হয়ে তাঁকে একে একে ছয়টি ছুরিকাঘাত করে। সাহাবীরা এগিয়ে গেলে আবু লুলু আরও ১৩ জনকে আঘাত করে, যাদের মধ্যে ৬ জন শহীদ হন। পরে সে আত্মহত্যা করে।

হযরত উমর (রা.) তখনই হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-কে ইমামতির দায়িত্ব দেন এবং নিজে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। জ্ঞান ফিরে আসার পর তিনি প্রশ্ন করেন, “আমাকে কে আঘাত করেছে?”

জানানো হয়— “আবু লুলু।”

তিনি বলেন, “আল্লাহর শুকরিয়া” “আমার রক্তে কোন মুসলমানের হাত রঞ্জিত হয়নি।”

তিনদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে হিজরী ২৩ সনের ২৭ জিলহজ্জ, বুধবার তিনি ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবীর হাতে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন— আলী, উসমান, আবদুর রহমান ইবন আউফ, সা’দ, যুবাইর ও তালহা (রা.)। তাঁদের মধ্য থেকে পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.) খলীফা নির্বাচিত হন। হযরত সুহায়িব (রাযি.) তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান এবং তাঁকে রওজা মোবারকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৬৩ বছর। তাঁর খেলাফতকাল ছিল ১০ বছর ৬ মাস ৪ দিন।

চলবে……