**এখানে খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল চারটি পর্বে তুলে ধরা হবে।**
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—কে হবেন তাঁর উত্তরসূরি, অর্থাৎ প্রথম খলীফা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল, কারণ দেরি হলে মুনাফিকরা ফায়দা তুলে নিতে পারত এবং মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরতে পারত। এ সেই ঐক্য, যে ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করতে নবীজী (সা.) তেইশ বছর ব্যয় করেছেন, তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এ সময় মদীনাবাসী আনসাররা “সাকীফা বনী সায়েদা” নামক স্থানে মিলিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন খলীফা নির্বাচনের প্রস্তাব দেন। তাঁদের দাবি ছিল, ইসলামের জন্য তাঁরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু মুহাজিরগণ এর বিরোধিতা করেন এবং বলেন, ইসলামের গোড়াপত্তন ও প্রসারে তাঁরাই মূল ভূমিকা রেখেছেন।
এই বিতর্কের মধ্যেই হযরত আবু বকর (রা.)-কে ডেকে আনা হয়। তিনি তখনো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মরদেহের পাশে ছিলেন। তিনি সাকীফায় এসে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য দেন, যা আনসারদের মুগ্ধ করে। অবশেষে সবাই একমত হন যে, হযরত আবু বকর (রা.)-ই হবেন ইসলামের প্রথম খলীফা। আর এভাবেই মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে প্রথম খলীফা হিসেবে মনোনীত হন হযরত আবু বকর (রা.)। খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর হযরত আবু বকর (রা.)-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ধর্মত্যাগ ও বিদ্রোহ দমন করা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে আরবের বহু অঞ্চলে অনেকে ইসলাম ত্যাগ করে আবার জাহেলিয়াতের দিকে ফিরে যেতে শুরু করে। কেউ কেউ কর (যাকাত) দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই কঠিন সময়ে হযরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত কঠোরতা ও সাহসিকতার সাথে এ সকল বিদ্রোহ দমন করেন এবং মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখেন। এই সমস্যা সমাধানের পর তিনি শুরু করেন ইসলামের আলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ। তিনি একত্রে পৃথিবীর দুই মহাশক্তি রোম ও পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন এবং মুসলিম বাহিনীকে বিজয়ের পথে পরিচালিত করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় কুরআন সহাবিদের মুখস্থ, চামড়া, পাতার খণ্ড ও হাড়ের টুকরায় লিখিত রূপে। কিন্তু কুরআন তখনও একটি নির্দিষ্ট বই আকারে সংকলিত হয়নি।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের সময় ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় ৩০০ জন হাফেজ শহীদ হন। এতে হযরত উমর (রা.) কুরআন গ্রন্থাকারে সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। আবু বকর (রা.) মুখস্থ ও লিখিত দলিল যাচাই করে কুরআনের আয়াতগুলো সংকলন করেন। এভাবে কুরআন প্রথম গ্রন্থ আকারে সংরক্ষিত হয়।
আবু বকর (রা.)-এর যুগে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল, শামের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ (বুসরা ও আশেপাশের অঞ্চল) মুসলিম সম্রাজের অধীনে আসে।
হিজরী ১৩ সনে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। পনেরো দিন ধরে অসুস্থ থাকার পর ২১শে জুমাদাল উখরা, বিকেলে তিনি ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে দাফন করা হয়। তাঁর খেলাফত কাল ছিল ২ বছর ৩ মাস ১০ দিন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ প্রথম কঠিন সময় সফলভাবে অতিক্রম করে এবং ইসলামের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।
চলবে………