ইয়ামামার যুদ্ধঃ ডিসেম্বর মাসে সংঘটিত ইসলামি ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ


রাসুল (সা.)-এর মৃত্যুর পর বেশ কয়েকটি আরব গোত্র নবগঠিত মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আবার কয়েকজন নিজেকে নবী বলেও দাবি করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন ‘মুসায়লিমা’। তিনি নিজেকে নবী বলে ঘোষণা করে এবং আকরাবার সমভূমিতে ৪০,০০০ সেনা একত্রিত করেন। খলিফা ‘আবু বকর (রা.)’ এই বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করার জন্য ১১টি সেনাদল গঠন করেন। তিনি ‘ইকরিমা (রা.)’-কে একটি সেনাদলের অধিনায়ক নিযুক্ত করেন, তাকে আদেশ দেওয়া হয় যাতে তিনি ‘মুসায়লিমা’-এর বাহিনীকে ইয়ামামায় আটকে রাখেন। কিন্তু তাকে আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, কারণ তার সেনাসংখ্যা আক্রমণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

কিন্তু ‘ইকরিমা (রা.)’ কয়েক দিন অবস্থান করার পর ‘মুসায়লিমা’ বাহিনীর উপর হামলা চালান। তবে ক্ষুদ্র এই মুসলিম বাহিনী ‘মুসায়লিমা’-এর ৪০,০০০ বাহিনীর কাছে টিকতে না পেরে পিছিয়ে আসে। এই খবর খলিফা ‘আবু বকর (রা.)’-এর কাছে পৌঁছালে, তিনি ‘ইকরিমা’-কে ফিরিয়ে এনে ‘শুরাহবিল (রা.)’-কে মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু তিনিও ‘ইকরিমা’-এর মতো একই কাজ করে বসেন এবং পরাজয়ের লজ্জা নিয়ে ফিরে আসেন।

তখন ‘খালিদ (রা.)’ জানতে পারেন যে ‘মুসায়লিমা’ বাহিনী ‘ইকরিমা’ ও ‘শুরাহবিল’-কে পরাজিত করেছে। এরপর তিনি খলিফা ‘আবু বকর (রা.)’-এর আদেশ পেয়ে ইয়ামামার দিকে রওনা হন। ‘খালিদ (রা.)’ যখন মাত্র ১৩ হাজার সেনা নিয়ে ‘মুসায়লিমা’-এর বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়ান, তখন ‘মুসায়লিমা’ তার ৪০,০০০ সেনার গর্ব করতে থাকেন। দুই বাহিনী যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, তখন ‘খালিদ (রা.)’ ‘মুসায়লিমা’-এর বাহিনীকে দ্বৈত যুদ্ধের আহ্বান জানান। তার আহ্বানে ‘মুসায়লিমা’-এর দুইজন সেনা এগিয়ে আসে, এবং ‘খালিদ (রা.)’ তাদেরকে হত্যা করেন। এরপর ‘খালিদ (রা.)’-এর সর্বাত্মক যুদ্ধের আদেশ দেন।

‘মুসায়লিমা’-এর বাহিনী প্রথমে প্রতিরক্ষা অবস্থানে চলে যায়, তবে শত চেষ্টা করেও মুসলিম বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষা প্রাচীরে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয় না। বিদ্রোহীদের শত শত লাশ পড়তে থাকে, কিন্তু তারা এক পা পিছিয়ে যায় না। (কারণ তাদের মধ্যে ছিল এক আজব বিশ্বাস, তারা ‘মুসায়লিমা’-কে নবী বলে মানত আবার ‘আল্লাহ’কেও মানত।)

এখন ‘মুসায়লিমা’ তার বাহিনীকে সর্বাত্মক হামলার নির্দেশ দেন। ‘মুসায়লিমা’-এর বাহিনী আক্রমণ শুরু করে, এবং মুসলিম বাহিনী এর আগে এমন মারাত্মক আক্রমণের সম্মুখীন হয়নি।

মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী ‘আবু হুজাইফা (রা.)’-এর আজাদকৃত গোলাম ‘সালিম (রা.)’ যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। সালিম (রা.) ছিলেন কুরআনের হাফেজ। তার তিলাওয়াত শুনে স্বয়ং ‘রাসূল (সা.)’ তাকে প্রশংসা করেছিলেন। এরপর ‘উমর (রা.)’-এর বড় ভাই ‘জায়েদ (রা.)’ পতাকা ধরেন এবং সাহাবীদের উৎসাহ দিয়ে বলেন, “হে লোকসকল! তোমরা দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই করো, আগে বেড়ে যুদ্ধ করতে থাকো।”

এক সময় ‘জায়েদ (রা.)’ও শহীদ হন। একে একে অনেক বিখ্যাত সাহাবী শহীদ হন। ‘মুসায়লিমা’-এর বাহিনী তাদেরকে তাড়াতে তাড়াতে তাবু পর্যন্ত নিয়ে আসে। এরপর ‘খালিদ (রা.)’ মুসলিম বাহিনীকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন, এবং প্রবল বেগে আবার আক্রমণ শুরু করেন। এতে শত্রুদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়।

‘মুসায়লিমা’-এর অনুসারীরা তখন দিগ্‌ভ্রম হয়ে পলায়ন করতে থাকে। যুদ্ধের ময়দান থেকে অল্প কিছু দূরে একটি বাগান ছিল। ‘মুসায়লিমা’-এর সেনাবাহিনীর এক চতুর্থাংশ এসময় সেখানে আশ্রয় নেয়। তারা একটি দেয়ালঘেরা বাগানে আশ্রয় নেয়। ‘মুসায়লিমা’ সেনাবাহিনীর ৭,০০০-এর কিছু বেশি সৈনিক বাগানে প্রবেশ করলে বিদ্রোহীরা গেট বন্ধ করে দেয়, ফলে মুসলিম বাহিনীতে স্বস্তি নেমে আসে।

এ সময় মুসলিম সৈনিক ‘আল-বারা ইবনে মালিক (রা.)’ এগিয়ে আসেন। তিনি ‘খালিদ (রা.)’-এর কাছে গেট খুলে দেওয়ার অনুমতি চান। ‘খালিদ (রা.)’ অনুমতি দেন এবং তিনি দেয়াল টপকে ভেতরে গিয়ে গেট খুলে দেন। এরপর মুসলিম বাহিনী বাগানে ঢুকে পড়ে।

‘খালিদ (রা.)’ ‘মুসায়লিমা’-কে খুঁজতে শুরু করেন, তবে ‘মুসায়লিমা’-কে হত্যার সৌভাগ্য তার হয়নি। ‘মুসায়লিমা’-কে হত্যা করেন ‘ওয়াহশি (রা.)’। (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উহুদের যুদ্ধে ওয়াহশি ‘হামযা (রা.)’-কে বর্শা দিয়ে হত্যা করেছিলেন।) তিনি বাগানে ঢুকে ‘মুসায়লিমা’-কে খুঁজে পান এবং তৎক্ষণাৎ তাকে বর্শা নিক্ষেপ করেন। ‘মুসায়লিমা’ মারা যান। তার মৃত্যুর সংবাদে বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে পড়ে, এবং বাকি বিদ্রোহীরা মুসলিমদের হাতে নিহত হয়। ইয়ামামার যুদ্ধে ৪০,০০০ বিদ্রোহীর মধ্যে ২১,০০০ নিহত হয়।