ইতিহাস বদলে দেওয়া এক যুদ্ধ।।খন্দকের যুদ্ধ

ওহুদ যুদ্ধের শেষে আবু সুফিয়ান প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে পরের বছর তারা আবার মদিনা আক্রমণ করবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও পরের বছর তিনি আর মদিনা আক্রমণের জন্য সেনাদল প্রস্তুত করেননি। এমন সময় ইহুদিদের কয়েকজন নেতা মক্কায় কুরাইশদের কাছে উপস্থিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের প্ররোচিত করে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। কুরাইশরাও এতে সম্মত হয়ে যায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী কুরাইশ, কেনানা ও তোহামাসহ অন্যান্য মিত্র গোত্র মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তাদের নেতা ছিল কাফিরদের সর্দার আবু সুফিয়ান। পথে বনু সালিম, সাতফান, ফাজারাহ, বনু আশজা সহ আরও বহু গোত্র কুরাইশ বাহিনীতে যোগ দেয়। এতে সম্মিলিত সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ হাজারে। এই বিশাল বাহিনীর আকার এত বড় ছিল যে, মদিনার নারী-শিশুসহ মোট জনসংখ্যাও এর সমান ছিল না। যদি এই বাহিনী হঠাৎ মদিনায় আক্রমণ চালাত, তাহলে মুসলমানদের জন্য তা হতো ভয়াবহ বিপদের কারণ।

এই সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে শূরার বৈঠকে বসেন এবং মদিনার প্রতিরক্ষার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে হযরত সালমান ফারসি (রা.)-এর একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। তিনি বলেন, পারস্যে শত্রু দ্বারা ঘেরাও হলে চারদিকে পরিখা খনন করা হতো। এটি ছিল একটি সুচিন্তিত ও অভিনব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা আরবরা আগে কখনো ব্যবহার করেনি।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই প্রস্তাব অনুমোদন করে সঙ্গে সঙ্গে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। সাহাবিদের দশজন করে দলে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি দলকে চল্লিশ হাত দীর্ঘ পরিখা খননের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুসলমানরা গভীর মনোযোগ ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজে লেগে যান, আর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও এই কঠোর শ্রমে অংশগ্রহণ করেন।

পরিখা খননের সময় এক জায়গায় একটি বিরাট পাথর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোদালের আঘাতে তা ভাঙা যাচ্ছিল না। তখন সাহাবিরা বিষয়টি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে জানান। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আঘাত করলে পাথরের একাংশ ভেঙে যায়। তখন তিনি বলেন, তাঁকে শাম দেশের চাবি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় আঘাতে তিনি বলেন, তিনি মাদায়েনের শ্বেত প্রাসাদ দেখতে পাচ্ছেন। তৃতীয় আঘাতে তিনি ঘোষণা করেন, আল্লাহ তাঁকে ইয়েমেনের চাবি দিয়েছেন এবং তিনি সানআর ফটক দেখতে পাচ্ছেন। এই ভবিষ্যদ্বাণী সাহাবিদের মনোবল আরও দৃঢ় করে তোলে।

পরিখা খনন শেষ হতেই কুরাইশ বাহিনী এসে উপস্থিত হয় এবং রুমা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) তিন হাজার মুসলিম সৈন্য নিয়ে ‘সালা’ নামক পাহাড়কে পেছনে রেখে অবস্থান নেন। পরিখাটি দুই বাহিনীর মাঝে এক অটল প্রতিরক্ষা দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।

জোট বাহিনী এসে দেখে যে একটি গভীর ও প্রশস্ত পরিখা তাদের অগ্রযাত্রা রোধ করে রেখেছে। তারা আগে কখনো এমন কৌশলের মুখোমুখি হয়নি। ইকরামা ইবনে আবু জাহেলের নেতৃত্বে একটি দল সংকীর্ণ একটি স্থান দিয়ে পরিখা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। তাদের মধ্য থেকে আমর ইবনে আবদে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানালে হযরত আলী (রা.) তার মোকাবিলা করেন এবং তাকে যুদ্ধে পরাজিত করে হত্যা করেন।

এরপর আবু সুফিয়ান কূটনীতির আশ্রয় নেয়। সে বনু নাযির গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবকে সঙ্গে নিয়ে বনু কুরাইযা গোত্রের কাছে যায় এবং তাদের সর্দার কা‘ব ইবনে আসাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়। এই কা‘ব ইবনে আসাদই আগে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন যে যুদ্ধের সময় তিনি মুসলমানদের সাহায্য করবেন। হুয়াই দরজায় উপস্থিত হলে কা‘ব প্রথমে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নানা প্ররোচনামূলক কথাবার্তার মাধ্যমে হুয়াই শেষ পর্যন্ত কা‘বকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয় এবং চুক্তি ভঙ্গ করতে রাজি করায়।

এদিকে হযরত নাঈম ইবনে মাসউদ (রা.) গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে বনু কুরাইযা ও কুরাইশদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেন। এর ফলে ইহুদি ও কুরাইশদের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নেয় এবং তাদের ঐক্য ভেঙে পড়ে।

অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় কাফির বাহিনীর মধ্যে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তাদের ঘোড়া ও উট মারা যেতে থাকে। এমন অবস্থায় এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়, যা তাদের শিবির সম্পূর্ণভাবে তছনছ করে দেয়। এই দুরবস্থায় আবু সুফিয়ান অবরোধ তুলে নিয়ে মক্কার পথে পলায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

পরদিন ভোরে মুসলমানরা দেখতে পান শত্রু শিবির সম্পূর্ণ ফাঁকা। তবে এবার তারা আর পরিখা অতিক্রম করে কুরাইশদের পরিত্যক্ত আসবাবপত্র লুট করতে বের হননি। ওহুদের যুদ্ধে সংঘটিত মারাত্মক ভুলের স্মৃতি তখনও তাদের হৃদয়ে তাজা ছিল। হযরত মুহাম্মদ (সা.) একজন গুপ্তচর পাঠিয়ে নিশ্চিত হন যে কুরাইশরা সত্যিই ফিরে গেছে। এরপর তিনি সবাইকে মদিনায় ফিরে আসার নির্দেশ দেন।

খন্দকের যুদ্ধ ছিল একটি সিদ্ধান্তমূলক ও ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুসলমানদের মনোবল বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং কাফিরদের শক্তি চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ে। ইসলাম রক্ষায় এই যুদ্ধ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) যথার্থই বলেছিলেন, “এবার আমরা ওদের ওপর আক্রমণ করব, ওরা আর আমাদের ওপর আক্রমণ করতে পারবে না।”