ইসলামি স্বর্ণযুগের ১০ মহান বিজ্ঞানী (শেষ পর্ব)

৬. ইবনুন নাফিস

ইবনুন নাফিস ছিলেন একজন প্রখ্যাত আরব চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসাবিদ। তাঁর জন্ম ১২১৩ খ্রিষ্টাব্দে, দামেস্ক, সিরিয়ায়। মানবদেহে রক্ত ও বায়ু সঞ্চালনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি যুগান্তকারী ধারণা প্রদান করেছিলেন।

রক্ত সঞ্চালন বিষয়ে তৎকালীন প্রচলিত গ্যালেনের মতবাদকে ভুল প্রমাণ করাই ইবনুন নাফিসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য। গ্যালেন বিশ্বাস করতেন যে হৃদপিণ্ডের দুই প্রকোষ্ঠের মাঝে অদৃশ্য ছিদ্র রয়েছে, যার মাধ্যমে রক্ত চলাচল করে। ইবনুন নাফিস এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে রক্ত হৃদপিণ্ড থেকে ফুসফুসে যায়, সেখানে বায়ুর সঙ্গে মিশে বিশুদ্ধ হয় এবং পরে আবার হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে “পালমোনারি সঞ্চালন” (Pulmonary Circulation) বলা হয়।

ইবনুন নাফিস বহু প্রাচীন ও ভ্রান্ত ধারণার বিরোধিতা করেন। তিনি ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার ছাড়াই খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চিকিৎসা পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। এছাড়াও তিনি মনোবিজ্ঞান, চক্ষুবিজ্ঞান ও মানব শারীরবিদ্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।

ফুসফুসের গঠন, শিরা-উপশিরার মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ, ইউরোলজি প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর মতামত স্থান পেয়েছে বিশাল আকারের গ্রন্থসমূহে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
“আল-শামিল ফি আল-তিব” (প্রায় ৩০০ খণ্ডে পরিকল্পিত),
“বুগিয়াত আল-তালিবিন ওয়া হুজ্জাত আল-মুতাতাব্বিন”,
এবং “আল-মুহাদ্দাব ফি আল-কাহল”।

বলা হয়ে থাকে, তিনি কল্পবিজ্ঞানধর্মী রচনাও করেছিলেন। তবে তাঁর অসাধারণ আবিষ্কার ও গবেষণাকর্ম প্রায় ৭০০ বছর ধরে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি থেকে আড়ালেই থেকে যায়।

এই মহান চিকিৎসাবিজ্ঞানী ১৭ ডিসেম্বর ১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দে, কায়রো, মিশরে মৃত্যুবরণ করেন।

৭. আবু বকর মুহম্মদ ইবনে যাকারিয়া আল রাজী

আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া আল-রাজী ছিলেন ইসলামি স্বর্ণযুগের একজন প্রখ্যাত পারস্যের চিকিৎসাবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, দার্শনিক ও পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর জন্ম ৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে, ইরানের তেহরানের নিকটবর্তী রে (Ray) নগরীতে, একটি ফার্সি বংশোদ্ভূত পরিবারে।

তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে স্মলপক্স (বসন্ত) ও হাম রোগের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেন। এছাড়াও তিনি বাগদাদে প্রথম মানসিক রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যা মনোরোগ চিকিৎসার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

রসায়ন বিজ্ঞানে আল-রাজী সালফিউরিক অ্যাসিড ও ইথানল (অ্যালকোহল) উৎপাদন ও বিশুদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর গবেষণা ও চিকিৎসা-পদ্ধতি মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

তিনি প্রায় দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে প্রায় এক শতাধিক চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো ‘আল-জুদারী ওয়াল-হাসবাহ’ নামক গ্রন্থটি, যেখানে তিনি বসন্ত ও হাম রোগের বিস্তারিত বিবরণ দেন। এই গ্রন্থটি ইংরেজি ভাষায় ১৪৯৮ থেকে ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়।

এছাড়াও তিনি ‘কিতাব আল-মনসুরী’ নামে দশ খণ্ডে বিভক্ত একটি বিশাল চিকিৎসা গ্রন্থ রচনা করেন, যা বহু শতাব্দী ধরে চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই মহান বিজ্ঞানী ৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে, প্রায় ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

৮. আলী ইবনে আব্বাস আল-মাজুসি

আলী ইবনে আব্বাস আল-মাজুসি ছিলেন ইসলামি স্বর্ণযুগের একজন প্রখ্যাত পারস্যের চিকিৎসক, শল্যচিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানী। তাঁর জন্ম পারস্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহওয়াজ অঞ্চলে একটি পার্সিক পরিবারে।

তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব আল-মালিকি’ (যা চিকিৎসা শিল্পের পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ নামে পরিচিত) রচনার জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই গ্রন্থে তিনি স্নায়ুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অভ্যন্তরীণ ঔষধ ও মৌলিক চিকিৎসাবিজ্ঞান-এর ওপর বিস্তৃত আলোচনা করেন।

আলী ইবনে আব্বাস আল-মাজুসি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন, যা সে সময়ে ছিল অত্যন্ত অগ্রগামী চিন্তা। তাঁর গবেষণা ও চিকিৎসা-দর্শন পরবর্তীকালে ইউরোপীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর গ্রন্থটি ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই মহান চিকিৎসাবিজ্ঞানী ৯৯২ বা ৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

৯. আবু রায়হান আল-বেরুনী 

আবু রায়হান আল-বেরুনী ছিলেন ইসলামী স্বর্ণযুগের একজন প্রখ্যাত খোয়ারিজমি–ইরানি পণ্ডিত ও বহুবিদ্যাবিশারদ। তাঁকে ইন্ডোলজির প্রতিষ্ঠাতা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জনক, আধুনিক জিওডেসির জনক এবং প্রথম নৃতত্ত্ববিদদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী একজন বিজ্ঞানী।

আল-বেরুনীর জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে, খোয়ারিজম অঞ্চলের শহরতলিতে একটি সাধারণ ইরানি পরিবারে। তিনি শতাধিক বিভিন্ন ধরনের ধাতু ও পাথর সংগ্রহ করে সেগুলো নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেন এবং প্রায় ১৮ ধরনের মূল্যবান ধাতু ও খনিজের ঘনত্ব নির্ণয় করেন।

তিনি স্থিতিবিদ্যা (Statics) ও গতিবিদ্যা (Dynamics)-কে একীভূত করে বলবিদ্যা (Mechanics) নামে গবেষণার একটি নতুন ক্ষেত্রের সূচনা করেন। আল-বেরুনীর রচিত গ্রন্থগুলোর বেশিরভাগই জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও ভূগোলভিত্তিক।

তিনি হাইড্রোস্ট্যাটিক ব্যালেন্স ব্যবহার করে ঘনত্ব নির্ণয়ের একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ত্রিকোণমিতির সাহায্যে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয়ের একটি কার্যকর পদ্ধতি তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন। এমনকি তিনি ধারণা করেছিলেন যে সূর্য সম্পূর্ণ স্থির নয়, যা সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত অগ্রসর চিন্তা।

এছাড়াও আল-বেরুনী মাধ্যাকর্ষণ, পৃথিবীর কক্ষপথ, চিকিৎসাবিদ্যা, জিওডেসি, উদ্ভিদবিদ্যাসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও মৌলিক গবেষণা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৪৬টি।

এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গবেষককে ইতিহাসে যথাযথভাবে সবসময় স্মরণ করা না হলেও, তিনি তাঁর সমকালীনদের তুলনায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জ্ঞানসমৃদ্ধ বিজ্ঞানী ছিলেন।

আল-বেরুনী ৬৩ বছর বয়সে একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হন, তবুও তিনি আরও ১২ বছর জীবিত ছিলেন। অবশেষে তিনি ১৩ ডিসেম্বর ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে (৪৪০ হিজরি, ২ রজব), ৭৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

১০. মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল-খারেজমি

মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল-খারেজমি ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফার্সি বহুবিদ্যাবিশারদ, যিনি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং ভূগোলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও স্থায়ী অবদান রেখেছেন। তাঁর জন্ম ৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে, খোয়ারিজমে।

৮২০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ গ্রন্থাগারে প্রধান জ্যোতির্বিদ ও পণ্ডিত হিসেবে নিযুক্ত হন।

গণিতে আল-খারেজমির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-জাবর’ ছিল বিপ্লবী, যা রৈখিক এবং দ্বিঘাত সমীকরণের পদ্ধতিগত সমাধান প্রথমবার বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছিল। এজন্য তাঁকে বীজগণিতের জনক বলা হয়।

দ্বাদশ শতাব্দীতে তাঁর পাটিগণিত পাঠ্যপুস্তক লাতিন ভাষায় ‘Algoritmo de Numero Indorum’ নামে অনূদিত হয়, যা ভারতীয় সংখ্যা ব্যবস্থাকে সংহত করে এবং পশ্চিমা বিশ্বের কাছে দশমিক স্থানপদ্ধতি চালু করে।

ভূগোলে আল-খারেজমি ক্লাউডিয়াস টলেমির দ্বিতীয় শতাব্দীর গ্রিক ভূগোল সংশোধন করে বিভিন্ন শহর ও এলাকার দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশ তালিকাভুক্ত করেন। তিনি জ্যোতির্বিদ্যা সারণি, বর্ষপঞ্জি, অ্যাস্ট্রোলাব ও সূর্যঘড়ি সংক্রান্ত কাজও করেন।

ত্রিকোণমিতিতে তিনি সাইন ও কোসাইন টেবিল তৈরি করেন এবং প্রথমবারের মতো ট্যানজেন্টের সারণি প্রণয়ন করেন, যা পরবর্তীকালের গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে।

এই মহান পণ্ডিত প্রায় ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে, প্রায় ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বর্তমান প্রজন্মের অনেক মানুষই এই মহান বিজ্ঞানীদের কথা জানে না। তারা জানেই না যে ইসলামি সভ্যতায় এমন অসংখ্য বিশ্বমানের বিজ্ঞানী জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যাঁদের অবদান আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

এটাও সত্য যে আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই এই ইতিহাস জানার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে কিছু ঐতিহাসিক ও লাতিন ভাষাভাষী লেখক এক প্রকারে এই মহান বিজ্ঞানীদের নাম পরিবর্তন বা বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন। ফলে তাঁদের প্রকৃত পরিচয় ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেছে।

যেমন—

  • ইবনে সিনা পরিচিত হয়েছেন এভিসিনা (Avicenna) নামে,
  • আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া আল-রাজী হয়েছেন রাজেস (Rhazes) বা রাজিজ,
  • হাসান ইবনুল হাইসাম হয়েছেন আলহাজেন (Alhazen),
  • আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান আল-আজদী হয়েছেন গেবার (Geber),
  • আর আলী ইবনে আব্বাস আল-মাজুসি পরিচিত হয়েছেন হালি আব্বাস (Haly Abbas) নামে।

এভাবে নানাভাবে তাঁদের ইসলামি পরিচয় ও প্রকৃত নাম আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে, যার ফলে অনেকেই আজ এসব মহান বিজ্ঞানীর প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে না। ইতিহাসের এই বিকৃত উপস্থাপন আমাদের জন্য বেদনাদায়ক হলেও সত্য।

গত পর্ব- ইসলামি স্বর্ণযুগের ১০ মহান বিজ্ঞানী (পর্ব-১)

সমাপ্ত