হযরত মুসআব বিন উমায়ের (রা.) আত্মত্যাগের এক অমর প্রতীক

রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দ্বিতীয় হিজরী সনে মক্কার কাফিরদের সঙ্গে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে সম্মুখীন হন। সেই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে এবং মক্কার কাফির বাহিনী শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হয়।

এরই প্রতিশোধ নিতে তৃতীয় হিজরী সনে তিন হাজার সেনা নিয়ে পুনরায় মদিনায় হামলা চালায় মক্কার কাফিররা। বেজে ওঠে উহুদ যুদ্ধের রণডঙ্কা। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাতশত মুসলিম মুজাহিদ নিয়ে বিশাল কাফির বাহিনীর মোকাবিলায় উপস্থিত হন। আর এই বাহিনীর পতাকাবাহী ছিলেন হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)।

এই যুদ্ধেও মুসলিমদের প্রথম আঘাতেই মক্কার কাফিররা পালাতে শুরু করে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে মনে করে গিরিপথে নিযুক্ত ৫০ জন তীরন্দাজের মধ্যে মাত্র ১২ জন ব্যতীত সবাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ অমান্য করে গনীমতের মাল আহরণে নেমে যায়। আর এই সুযোগে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে)–এর নেতৃত্বে কাফির অশ্বারোহীরা মুসলিম বাহিনীর পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালায়।

এই আকস্মিক হামলায় মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে।

সেই সময় যে কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)। তিনি বীরদর্পে এক হাতে ইসলামের পতাকা এবং অন্য হাতে বিদ্যুৎগতিতে তরবারি চালাতে থাকেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শত্রুদের দৃষ্টি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দিক থেকে সরিয়ে নিজের দিকে আকর্ষণ করা। এভাবে তিনি সেদিন নিজের একক সত্তাকেই একটি বাহিনীতে পরিণত করেন। শত্রুবাহিনী তাঁর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁর দেহের ওপর দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

একপর্যায়ে কাফির বাহিনী তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং অভিশপ্ত কাফির ইবনে কামিয়াহ তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

প্রথমে সেই অভিশপ্ত অশ্বারোহী কাফির ইবনে কামিয়াহ তাঁর ডান হাতে আঘাত করে, ফলে তাঁর ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অবস্থায় হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) পাঠ করতে থাকেন—

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ
“মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল; তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন।”
(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৪)

এরপর তিনি ঝুঁকে বাম হাতে পতাকা ধরেন। ইবনে কামিয়াহ তখন বাম হাতে আঘাত করে, ফলে তাঁর বাম হাতও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পতাকা ঝুঁকে পড়লে তিনি উভয় বাহু দিয়ে বুকের সঙ্গে পতাকা জড়িয়ে ধরেন এবং পুনরায় পাঠ করতে থাকেন—

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ

অতঃপর অভিশপ্ত কামিয়াহ তৃতীয়বার বর্শা দিয়ে আঘাত করে। বর্শা তাঁর দেহ এপার-ওপার ভেদ করে যায়। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) জমিনে লুটিয়ে পড়েন এবং ইসলামের পতাকা ভূপাতিত হয়।

লক্ষণীয় যে, শাহাদাতের পূর্বে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) যে বাক্যটি বারবার উচ্চারণ করছিলেন, তখনো তা কুরআনের আয়াত হিসেবে নাযিল হয়নি। উহুদের এই ঘটনার পরই ‘ওয়া মা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল…’ আয়াতটি নিয়ে হযরত জিবরীল (আ.) অবতীর্ণ হন।

যুদ্ধ শেষে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-এর লাশ পাওয়া যায়। রক্ত ও ধুলোবালিতে একাকার তাঁর চেহারা। লাশের পাশে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) অঝোরে কেঁদে ফেলেন।

এক সময়ের মক্কার দামি পোশাকে সজ্জিত সুদর্শন যুবক, ধনীর দুলাল শহীদ হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-কে কাফন দেওয়ার মতো একটি পূর্ণ কাপড়ও পাওয়া যায়নি। যে কাপড়টি পাওয়া যায়, তা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যায়, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে আসে।

অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী চাদর দিয়ে যতটুকু সম্ভব মাথা ঢেকে দেওয়া হয় এবং পায়ের অংশ ‘ইযখির’ (একপ্রকার ঘাস) দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-এর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত করেন—

مِنَالْمُؤْمِنِينَرِجَالٌصَدَقُوامَاعَاهَدُوااللَّهَعَلَيْهِ
“মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে।”

এরপর তাঁর কাফনের চাদরের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি—তোমার চেয়ে কোমল চাদর ও সুন্দর পোশাক কারো ছিল না। আর আজ তুমি এই চাদরে ধুলোমলিন অবস্থায় পড়ে আছ।”

তিনি আরও বলেন,
“আল্লাহর রাসূল সাক্ষ্য দিচ্ছেন, কিয়ামতের দিন তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে সাক্ষ্যদানকারী হবে।”

এরপর সাহাবীদের দিকে ফিরে তিনি বলেন,
“হে লোকসমষ্টি! তোমরা তাঁদের যিয়ারত করো, তাঁদের কাছে আসো এবং তাঁদের ওপর সালাম পেশ করো। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার জীবন—কিয়ামত পর্যন্ত যে কেউ তাঁদের ওপর সালাম পেশ করবে, তাঁরা অবশ্যই সেই সালামের জবাব দেবেন।”