যে দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর পবিত্র রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল তায়েফের মাটি

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু তালিব ও তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুতে কাফেররা আবার লাগামছাড়া হয়ে গেল।
একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি স্থানে নামাজ পড়ার জন্য নতজানু হয়ে আছেন—এমন সময় পেছন দিক থেকে উকবা নামক এক কাফের এসে একটি চাদর দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গলায় ফাঁস লাগিয়ে ধীরে ধীরে চাদরটি মোড়াতে লাগল। ফলে শীঘ্রই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম হলো। ঘটনাক্রমে ঠিক এই সময় হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উপস্থিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কোনোক্রমে রক্ষা করলেন। কিন্তু এর জন্য আবু বকর (রা.)-কে প্রচুর শাস্তি ভোগ করতে হলো। দুর্বৃত্তদের হাতে তিনি ভীষণভাবে নির্যাতিত হলেন।
এরূপভাবে প্রতিদিন লাঞ্ছনা ও নিগ্রহ চলতে লাগল। কখনো একদল লোক তাঁর পেছনে পেছনে থেকে নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও গালাগালি দিত, কখনো বা তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা পুঁতে রাখত, কখনো বা তাঁর খাদ্যদ্রব্যে মলমূত্র মিশিয়ে দিত, আবার কখনো ঘৃণ্য আবর্জনা তাঁর শরীরে নিক্ষেপ করত। এভাবেই তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অতিষ্ঠ করে তুলল।
হায় আফসোস! দুনিয়ায় আজ এমন দরদি কেউ নেই, যে এই দুর্দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দুটি সান্ত্বনার কথা শোনাবে। পিতৃতুল্য চাচা নেই, প্রিয়তম স্ত্রী নেই; অসহায় কন্যারা পিতার এই শোচনীয় অবস্থা দেখে কেঁদে আকুল; সাহাবিরাও আজ তাঁর মতোই লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত। কার মুখের দিকে কে তাকায়, কে কাকে সান্ত্বনা দেয়! কিন্তু কী আশ্চর্য! এ মুসিবতের দিনেও রাসূলুল্লাহ (সা.) বিচলিত হলেন না। আল্লাহর ওপর তাঁর নির্ভরতা আরও গভীর হলো। নিজের কথা ভুলে গিয়ে তিনি অন্য সকলকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।
ক্রমে ক্রমে অবস্থা এমন সঙ্গীন হয়ে উঠল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য মক্কায় অবস্থান করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ল। তিনি বাধ্য হয়ে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বুঝলেন—মক্কায় আপাতত ইসলাম প্রচারের আর কোনো সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু যাবেন কোথায়? এমন কোনো স্থান আছে কি, যেখানে তিনি সাদরে গৃহীত হবেন? অনেক ভেবে-চিন্তে তিনি তায়েফে গমনের সিদ্ধান্ত নিলেন।
মক্কা থেকে প্রায় ৭০ মাইল দূরে তায়েফ নগরী অবস্থিত। মক্কার পরেই এর স্থান। তায়েফবাসীদের সঙ্গে মক্কার কাফেরদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তায়েফবাসীরাও কাফেরদের মতো মূর্তিপূজা করত এবং কাবাই ছিল তাদের প্রথম তীর্থক্ষেত্র। একই দেব-দেবীর পূজা করত এবং একই রীতিনীতি ও কুসংস্কার মেনে চলত তারা। আর সেই তায়েফ নগরীতেই রাসূলুল্লাহ (সা.) আশ্রয় খুঁজতে চললেন। সঙ্গে চললেন তাঁর একমাত্র ভক্ত ও পালিত পুত্র জায়েদ (রা.)।
দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করে রাসূলুল্লাহ (সা.) পদব্রজে তায়েফে পৌঁছালেন। সেখানে পৌঁছেই তিনি তায়েফবাসীদের আল্লাহর পথে আহ্বান জানালেন এবং সত্য প্রচারে তাদের সহায়তা ও সহানুভূতি কামনা করলেন। কিন্তু কেউই তাঁর আহ্বানে সাড়া দিল না। এরপর তিনি তায়েফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। সে সময় বনু সাকীফ গোত্র ধন-সম্পদ ও মর্যাদায় তায়েফে বিশেষভাবে খ্যাত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করলেন। কিন্তু আফসোস! তারা পাথরের মতো অটল ও নির্লিপ্ত রইল।
কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলল, “হুঁ! আল্লাহ বুঝি আর কাউকে খুঁজে পেল না, তাই তোমাকেই নবী বানাল?” (নাউজুবিল্লাহ)
আরেকজন বলল, “ভালোই দেখেছ! আল্লাহর রাসূল কি কখনো পায়ে হেঁটে আসে?” (নাউজুবিল্লাহ)
আবার কেউ বলল, “হে মুহাম্মদ, তোমার সঙ্গে কথা বলে আমাদের কোনো লাভ নেই, তোমারও কোনো লাভ নেই। তুমি যদি সত্যিই আল্লাহর রাসূল হও, তাহলে তোমার বিরোধিতা করলেই তুমি আমাদের সর্বনাশ করবে। আর যদি তুমি ভণ্ড তপস্বী হও, তবে আমরাই হব তোমার চরম শত্রু। কাজেই তুমি ফিরে যাও।” (নাউজুবিল্লাহ)
এভাবেই তিনি অপমান ও নির্যাতনের শিকার হতে লাগলেন।
তবু রাসূলুল্লাহ (সা.) নিরাশ হলেন না। তিনি তাওহিদের অমৃত বার্তা মানুষে মানুষে ছড়িয়ে দিতে লাগলেন—পথে পথে, ঘরে ঘরে আল্লাহর মহিমা প্রচার করলেন। এভাবে দশ দিন কেটে গেল, কিন্তু কোনো ফল পাওয়া গেল না। বরং তায়েফবাসীদের শত্রুতা দিন দিন বেড়েই চলল। শেষ পর্যন্ত তারা প্রকাশ্য বিদ্রোহে নেমে পড়ল। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে শহর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য তারা একদল লোককে লেলিয়ে দিল।
তিনি যে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই পথেই লোকেরা তাঁর পেছনে পেছনে বিদ্রূপ ও গালাগালি করতে করতে চলল। শুধু তাই নয়, দুর্বৃত্তরা তাঁর দিকে পাথর নিক্ষেপ করতেও শুরু করল। পাথরের আঘাতে তাঁর দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠল। তাতেও তারা থামল না; পথের দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে বসে তিনি যখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর পায়ের দিকে পাথর ছুড়ে মারতে লাগল। পুরো পথজুড়ে ওই জাহেল ও নিষ্ঠুর লোকদের কটু হাসি আর চিৎকারে পরিবেশ ভরে উঠল।
জায়েদ (রা.) প্রাণপণ চেষ্টা করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু শত শত মানুষের আক্রমণের সামনে মাত্র দু’জন কতক্ষণই বা টিকে থাকতে পারেন? ধীরে ধীরে রাসূলুল্লাহ (সা.) অবসন্ন ও অচেতন হয়ে পড়লেন। তাঁর শরীর থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। জায়েদ (রা.) নিজেও ভীষণভাবে আহত হলেন; কিন্তু এই অবস্থাতেও তিনি নিজের দায়িত্ব থেকে একটুও বিচলিত হননি। তিনি কাঁধে করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কোনোভাবে শহরের বাইরে নিয়ে এলেন।
সামনেই ছিল একটি প্রাচীরঘেরা আঙুরবাগান। সেখানে গিয়ে জায়েদ (রা.) আশ্রয় নিলেন। নিজের কষ্টের কথা ভুলে গিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেবা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জ্ঞান ফিরে এল। তখন প্রথমেই তাঁর মনে পড়ল নামাজের কথা। তিনি অজু করতে চাইলেন। জায়েদ (রা.) অত্যন্ত কষ্টে তাঁর রক্তাক্ত ও ফোলা পা থেকে জুতা খুলে দিলেন। সে দৃশ্য দেখে জায়েদ (রা.) কেঁদে ফেললেন। হায়! যে পা ছিল সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়, সেই পবিত্র পায়ের আজ এই অবস্থা!
রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজ আদায় করে দুই হাত তুলে মুনাজাত করতে লাগলেন। অত্যাচারী জালিমদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করার কিংবা তাদের ধ্বংস কামনার এটাই তো ছিল উপযুক্ত সময়। কিন্তু বিশ্বপ্রেমিক মহান মানুষটি কী প্রার্থনা করলেন—একবার শুনুন:
“হে আল্লাহ, হে আমার প্রভু! তোমার কাছে আমি ফরিয়াদ করছি। অবিশ্বাসীরা আজ না বুঝে যে গুরুতর অপরাধ করেছে, তার জন্য তুমি দয়া করে তাদের শাস্তি দিও না। তাদের ক্ষমা কর। তারা আজ তোমার বাণী গ্রহণ করছে না—এটা তাদের দোষ নয়; এটা আমারই দুর্বলতা, আমারই অক্ষমতা। এই দুর্বলতার জন্য আমি তোমার সাহায্য চাই। হে রহমান, হে রহিম! একমাত্র তুমিই দুর্বলের শক্তি, তুমিই অসহায়ের আশ্রয়। তুমি ছাড়া আমার আর কোনো সাহায্য নেই, কোনো আশ্রয় নেই। হে প্রভু! আমার এই সাধনা কি ব্যর্থ হবে? তুমি কি আমাকে বিজয় দান করবে না? তুমি কি আমাকে এমন শত্রুদের হাতে তুলে দেবে, যারা চিরকাল তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে? যদি তোমার ইচ্ছা এটাই হয়, তবে তাই হোক। একমাত্র তোমার সন্তুষ্টিই আমার কাম্য। তুমি সন্তুষ্ট থাকলে কোনো অপমান, কোনো গ্লানি, কোনো বিপদ বা দুঃখ-কষ্টই আমি ভয় করি না। তুমিই আমার একমাত্র ভরসা।”
কী গভীর আবেগময় আত্মসমর্পণ! আল্লাহর প্রতি কী অগাধ বিশ্বাস! মানুষের প্রতি কী অপরিসীম মমতা! সত্যের প্রতি কী অবিচল নিষ্ঠা! এমন না হলে কি কেউ মহাপুরুষ হতে পারে?
ঠিক এই হৃদয়বিদারক মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ওহি নাজিল হলো—
“ধৈর্য ধরো—চরম ধৈর্য। নিশ্চয়ই তারা (অবিশ্বাসীরা) এই বিজয়কে অনেক দূরের বিষয় মনে করছে, কিন্তু আমরা একে খুবই নিকটবর্তী দেখছি।”
— (সূরা আল-মা‘আরিজ, ৭০:৬–৭)
এই গভীর আশ্বাসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয় ভরে উঠল। বিজয়ের আনন্দময় স্বপ্নে তিনি সব দুঃখ ও যন্ত্রণা ভুলে গেলেন এবং বারবার আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করতে লাগলেন।
পরিশেষে তায়েফের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা মানবজাতির ইতিহাসে ধৈর্য, ক্ষমা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যে মানুষটিকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করা হয়েছিল, যাঁকে শহর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই মানুষটিই আবার সেই অত্যাচারীদের জন্য ধ্বংস নয়—হেদায়েত কামনা করেছিলেন। এখানেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহত্ত্ব, এখানেই তাঁর নবুয়তের সত্যতা।
আমাদের জীবনে যখন দুঃখ, অপমান, ব্যর্থতা ও নিরাশা ঘিরে ধরে—তখন তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে মাথা নত করা সেই মহামানবের কথা স্মরণ করা উচিত। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, প্রতিশোধ নয়—ক্ষমাই শ্রেষ্ঠ; হতাশা নয়—আল্লাহর ওপর ভরসাই মুমিনের আসল শক্তি।
আজ আমরা হয়তো সামান্য কষ্টেই ভেঙে পড়ি, অল্প অপমানেই হাল ছেড়ে দিই। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) সমস্ত পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই নিজের একমাত্র কাম্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। তাই আমাদের উচিত—তাঁর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ধাপে অনুসরণ করা, সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং মানুষের প্রতি সদয় ও ক্ষমাশীল হওয়া।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে তায়েফের সেই ধৈর্য দান করো, আমাদের চরিত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই ক্ষমা ও মমতা দান করো। জীবনের সব পরীক্ষায় যেন আমরা তাঁর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে থাকতে পারি—এই তাওফিক আমাদের সবাইকে দান করো। আমিন।
“পড়ার জন্য ধন্যবাদ”