এক সময় পৃথিবীতে চরম উচ্ছৃঙ্খলতা, পাপাচার, দুরাচার, ব্যভিচার, মিথ্যাচার, হত্যা, লুণ্ঠন, মদ্যপান, জুয়া, অন্যায়-অপরাধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের ভয়াবহ চিত্র বিরাজ করছিল। সমাজজীবন ছিল নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত, মানবিক মূল্যবোধ ছিল প্রায় বিলুপ্ত। নারী ছিল অবহেলিত, দুর্বল ছিল নির্যাতিত, শক্তিশালীর হাতে দুর্বল ছিল অসহায়। এমন এক অন্ধকার ও বিভীষিকাময় সময়ে মানবতার মুক্তির দিশারি হিসেবে, সারা জাহানের হিদায়াতের জন্য পৃথিবীতে আবির্ভূত হন সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহ তায়ালার এক অনন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত নবী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে “রহমাতুল্লিল আলামিন”—সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি শুধু মুসলমানদের জন্যই নন, বরং জাতি, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি ও ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ মানব। কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য তিনি এক পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণেই রয়েছে মানবিক মর্যাদা, ন্যায় ও ইনসাফের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন।
তাঁর অনুপম ব্যক্তিত্ব ও আদর্শের আলোয় গোত্রে-গোত্রে, বর্ণে-বর্ণে, জাতিতে-জাতিতে ও শ্রেণিতে-শ্রেণিতে বিভক্ত বিপর্যস্ত পৃথিবী একসময় ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের সন্ধান পেয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে কায়েম হয়েছিল প্রেম, প্রীতি, সাম্য ও সৌহার্দ্যের এক অতুলনীয় সমাজব্যবস্থা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সমাজব্যবস্থা আর কোথাও দেখা যায়নি, যেখানে ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত, সাদা-কালো, আরব-অনাবর—সবাই সমান মানবিক মর্যাদা পেয়েছে।
পৃথিবীতে এমন কোনো বিবেকবান মানুষ নেই, যিনি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মহামানব হিসেবে স্বীকার না করেন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বহু অমুসলিম ও বিধর্মী মনীষী অকপটে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মার্কিন গবেষক মাইকেল এইচ. হার্ট ১৯৭৮ সালে রচিত বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ১০০’-এ মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রথম স্থানে স্থান দেন। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের সংশোধিত সংস্করণেও তাঁর এই অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে, যা তাঁর বিশ্বজনীন প্রভাব ও অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি।
ন্যায়, ইনসাফ ও শান্তির বার্তাবাহক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও চরিত্র অধ্যয়ন করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অগণিত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত ও আগতব্য সকল মানুষের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ নবী ও শ্রেষ্ঠ রাসুল। তিনি আল্লাহ রব্বুল আলামিনের বিশেষ সৃষ্টি, সৃষ্টিকুলের সেরা সৃষ্টি। বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের প্রশ্ন এখানে মুখ্য নয়; ইতিহাস, যুক্তি ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত আগত কোনো মানুষ সম্পর্কে তাঁর মতো বিস্তারিত, নির্ভুল ও সুসংরক্ষিত জীবনচিত্র পাওয়া যায়নি। তাঁর জন্ম, শৈশব, যৌবন, পারিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, যুদ্ধনীতি, দাওয়াতি কার্যক্রম—প্রতিটি দিক ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অন্য কোনো ধর্মনেতা, রাষ্ট্রনায়ক বা দার্শনিকের ক্ষেত্রে এমন সর্বাঙ্গীণ ও স্বচ্ছ জীবনচিত্র পাওয়া যায় না।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানবতার এক মহান শিক্ষক। তিনি গোটা মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ শিক্ষক হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। মাত্র ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে তিনি আরব উপদ্বীপের অশিক্ষিত, বর্বর ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে জ্ঞান, নৈতিকতা, সভ্যতা ও মানবিকতার আলোয় আলোকিত করেন। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শের প্রভাবে সেই মরুবাসীরাই পরবর্তীতে সমগ্র পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার দীপ্তিময় মশাল বহন করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণ ও হিদায়াতের এমন এক আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলিত করেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে ন্যায়, ইনসাফ, শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির পথ দেখিয়ে যাবে। অতি স্বল্প সময়ে তিনি যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছেন, তা দেখে বিস্মিত হয়েছিল তাঁর চরম বিরোধীরাও। এটি ছিল তাঁর শিক্ষা ও চরিত্রের অলৌকিক প্রভাব।
রাসুল (সা.)-এর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সরল, সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর। বাসস্থান, পোশাক, খাদ্য—সবক্ষেত্রেই তিনি সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করতেন। তিনি বিলাসিতা অপছন্দ করতেন এবং দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। খাবারের স্বাদ কম-বেশি কিংবা রান্নার ত্রুটি নিয়ে তিনি কখনো অভিযোগ করতেন না। বরং অন্যের মন কষ্ট না দেওয়াকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।
তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাঁর চরিত্রকে “মহান চরিত্র” হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শত্রুর প্রতিও তাঁর আচরণ ছিল ক্ষমাশীল, সহনশীল ও মানবিক। তায়েফে নির্মম নির্যাতনের পরও তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে তাদের জন্য দোয়া করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি বছরের পর বছর নির্যাতনকারী কাফেরদের প্রতিও কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা ঘোষণা করে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক ও নিরপেক্ষ বিচারক। বিচারকার্যে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রভাবশালী কারো প্রতিই তিনি পক্ষপাতিত্ব করেননি। মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই তাঁর কাছ থেকে ন্যায়বিচার পেয়েছে।