কাদিসিয়ার যুদ্ধঃ কাকা’ বিন আমর (রা.) এর বীরত্বগাঁথা এক যুদ্ধ

কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) দামেস্কের যুদ্ধের পর কেবল একটু বিশ্রাম নিতে চাইলেন। কিন্তু তখনই আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আবু উবাইদা ইবনে আল-জাররাহ (রা.)-কে একটি চিঠি লিখে পাঠালেন।

সে চিঠিতে তিনি লিখলেন—
“তোমার সৈন্যবাহিনী থেকে কিছু সৈন্য আলাদা করে খুব দ্রুত কাদিসিয়ায় সা‘দ বিন আবু ওয়াক্কাসের নিকটে প্রেরণ কর।”

খবর পাওয়ার সাথে সাথে আবু উবাইদা (রা.) কা‘কা‘ বিন আমর (রা.)-এর নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন।

কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) বুঝতে পারলেন, গতকাল মুসলমানদের জন্য দিনটি অত্যন্ত কঠিন ছিল; কেননা কাফিরদের সংখ্যা ও রসদ মুসলমানদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তাঁর এই এক হাজার সৈন্যই বা কতটুকু সাহায্য করতে পারবে? এক ফোঁটা পানি যেমন বিশাল সমুদ্রের উচ্চতা বাড়াতে পারে না, তেমনি লক্ষ লক্ষ কাফির সৈন্যের মোকাবেলায় কি এই এক হাজার সৈন্যই মুসলিমদের সাহায্যে যথেষ্ট?

এই চিন্তার মাঝেই তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছু দূরে এসে তাঁর বাহিনীকে থামতে নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি তাঁর এক হাজার সৈন্যকে দশটি দলে ভাগ করলেন।

তিনি প্রতিটি দলকে নির্দেশ দিলেন—
“প্রথম বাহিনীটি চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় বাহিনীটি রওনা হবে না। আর প্রথম বাহিনীর উড়ানো বালুকণা মাটিতে মিশে যাওয়ার আগেই দ্বিতীয় বাহিনীটি রওনা হবে।”

এর উদ্দেশ্য ছিল, যেন কাফিররা বালুর ধুলো দেখে ধারণা করে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশি।

এরপর কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) প্রথম দলটি নিয়ে তাকবীর দিতে দিতে এগিয়ে গেলেন। পারস্যের সৈন্যরা মুসলমানদের প্রথম দলের আগমন লক্ষ্য করলেও প্রথমে তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।

কিন্তু যখন দিগন্তরেখা থেকে একের পর এক সেনাদল ধুলো উড়িয়ে আসতে লাগল, তখন তাদের অন্তরে ধীরে ধীরে ভয় বাড়তে লাগল। কারণ আগের দিন মাত্র ত্রিশ হাজার মুসলিম সৈন্যের সাথেই যুদ্ধ করে তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আজ আবার বালুর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে কত লক্ষ সৈন্য আসছে—তা তারা বুঝতে পারছিল না। তারা ধারণা করল, মুসলমানদের আগত বাহিনী অগণিত।

অন্যদিকে মুসলমানদের অন্তরে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দীপনা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) মুসলমানদের কাতার থেকে এগিয়ে এসে বললেন—
“কোন ব্যক্তি কি আছে, যে আমার সাথে লড়াই করবে?”
“কোন ব্যক্তি কি আছে, যে আমার সাথে লড়াই করবে?”

সকল সৈন্য অপেক্ষায় ছিল—কে এমন সাহসী ব্যক্তি, যে কা‘কা‘ বিন আমর (রা.)-এর সাথে লড়াই করতে এগিয়ে আসবে।

ঘোষণার কিছুক্ষণ পর পারস্য বাহিনী থেকে এক অশ্বারোহী বেরিয়ে এলো। সে বলল—
“আমি তোমার সাথে লড়াই করব। তুমি কি জান আমি কে?
আমি ইয়াওমুল জিসরের দিনে পারস্য বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব পালনকারী জুল হাজিব বাহমান।
আমি তোমাদের নেতা আবু উবাইদা আস-সাকাফী ও তার সাথীদের হত্যাকারী।”

কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) সিংহের মতো বাহমানের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি একের পর এক আঘাত করতে লাগলেন এবং বাহমানের আঘাত প্রতিহত করতে থাকলেন।

পারস্য সৈন্যদের অন্তর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তারা বাহমান ও কা‘কা‘ বিন আমর (রা.)-এর দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করে রাখল।

অন্যদিকে মুসলমানদের মুখে বারবার তাকবীর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তারা বলছিল—
“হে কা‘কা‘! তাকে শেষ করে দাও। আবু উবাইদা আস-সাকাফীর হত্যার প্রতিশোধ নাও।”

ঠিক তখনই কা‘কা‘ বিন আমর (রা.)-এর পাহাড়সম এক আঘাতে বাহমান মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার শরীর থেকে রক্ত স্রোতের মতো প্রবাহিত হতে লাগল।

মুসলমানরা “আল্লাহু আকবার” ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলল। বাহমানের মৃত্যু মুসলমানদের বিজয়ের সূচনা করল।

এরপর কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) আবার ডাক দিলেন—
“তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে আমার সাথে লড়াই করবে?”

তখন পারস্য বাহিনী থেকে একসাথে দুইজন অশ্বারোহী বেরিয়ে এলো। কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) ও হারিস বিন জুবাইয়ান (রা.) তাদের দু’জনকেই বাহমানের মতো ধরাশায়ী করলেন।

এরপর আরও কয়েক দফায় কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) আরও কয়েকজন পারস্য সেনাকে হত্যা করলেন।

পরে তিনি ঘোষণা দিলেন—
“হে মুসলমানদের দল! তোমরা তোমাদের শত্রুদের সাথে তরবারি নিয়ে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হও। বর্শা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো। যখন তারা তোমাদের সাথে মিশে যাবে, তখন তরবারি দ্বারা আঘাত করো।”

এই আহ্বান শুনে মুসলমানরা সিংহের মতো কাফিরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাদের কচুকাটা করতে লাগলেন।

সেদিন পারস্যরা আর হাতিগুলোকে মাঠে নামাতে পারেনি; কারণ আগের দিনের আঘাতে হাতিগুলো আহত হয়ে পড়েছিল।

অন্যদিকে কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) দশটি উট নিয়ে আসতে আদেশ দিলেন। উটগুলোকে কালো কাপড়ে ঢেকে প্রতিটিতে একজন করে আরোহী বসালেন। এরপর উটগুলোকে কাফিরদের দিকে হাঁকিয়ে দেওয়া হলো।

কালো আবৃত এই অচেনা প্রাণীগুলো দেখে পারস্য ঘোড়াগুলো ভয়ে দিকবিদিক ছুটতে লাগল। যত চেষ্টা করেও পারস্য সৈন্যরা তাদের ঘোড়াগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারল না।

মুসলমানরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পালিয়ে যাওয়া অশ্বারোহীদের পেছনে ধাওয়া করল এবং তাদের উপর আঘাত হানল।

এভাবে কা‘কা‘ বিন আমর (রা.) নিজের হাতেই ত্রিশজন কাফিরকে হত্যা করেন।

সেদিনের যুদ্ধ শেষ হলে মুসলমানরা আল্লাহর প্রশংসা করতে লাগলেন এবং তাকবীর ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে বললেন—
“এ দিনটি গতকালের প্রতিশোধ।”

এটাই ছিল কা‘কা‘ বিন আমর (রা.)-এর জন্য যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনের কঠিন পরীক্ষা।

**পরবর্তী অন্য কোন পর্বে কাকা বিন আমর (রা.)এর জিবনী নিয়ে লেখা প্রকাশ করা হবে ইনশাল্লাহ**