মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়

ব্যবসায়িক কাজে শ্রীলঙ্কা দ্বীপে অনেক পূর্ব থেকেই বহু আরব বসবাস করত। ইসলামের আবির্ভাবের পর এখানকার আরবদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেন। এ কারণে সেখানে বেশ কিছু মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষালয় নির্মিত হয়। এছাড়াও শ্রীলঙ্কার রাজার সঙ্গে মুসলমানদের সুসম্পর্ক ছিল।

এরপর ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে শ্রীলঙ্কা থেকে একটি জাহাজে করে ঐ অঞ্চলে বসবাসরত মুসলমান পুরুষগণ হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁদের মধ্যে আবুল হাসান নামক এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীও ছিলেন, যিনি লঙ্কা দ্বীপে বসবাসরত মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন। কিন্তু এক বছর পার হয়ে গেলেও ঐ জাহাজ ও জাহাজের যাত্রীদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। এমনকি সৌদি আরব কিংবা তৎকালীন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেও অনুসন্ধান চালিয়ে তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তখন ধারণা করা হলো—হয় জাহাজটি সিন্ধু উপকূলে এসে জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, অথবা সেটি সাগরে ডুবে গেছে।

এভাবেই কয়েক বছর কেটে যায়। তখন উমাইয়া শাসক ছিলেন আল-ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক। মুসলমানদের এই দুর্দশার কথা খলিফার কানে পৌঁছালে যুবায়ের নামক এক প্রতিনিধিকে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়। যুবায়ের শ্রীলঙ্কায় গিয়ে সকলের সঙ্গে কথা বলে তাদের মতামত জানতে চান। অধিকাংশ এতিম ও বিধবা নারী আরবে ফিরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, কারণ শ্রীলঙ্কায় তাদের অভিভাবক বলতে কেউ ছিল না। সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। শ্রীলঙ্কার রাজা আল-ওয়ালিদের জন্য অঢেল ধন-সম্পদ ও উপঢৌকনসহ একটি জাহাজ পূর্ণ করে দেন। অপর একটি জাহাজে ওঠানো হয় মুসলিম নারী ও শিশুদের।

৭১১ সালের জুন মাসে ভারত মহাসাগরের তীর ঘেঁষে দুটি জাহাজ এগিয়ে চলে। একটিতে ছিল ধন-সম্পদ ও উপঢৌকন, অপরটিতে ছিল বৃদ্ধ, অসহায় নারী ও শিশুরা। সিন্ধু বন্দরের নিকটবর্তী হলে জাহাজগুলো জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। সিন্ধুর উপজাতি মেদ এবং রাজা দাহিরের সৈন্যরা একত্রিত হয়ে এই আক্রমণ চালায়। তারা সব ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে যায় এবং নারী-পুরুষ সকল যাত্রীকে বন্দি করে। প্রতিরোধ করতে গেলে অনেককে হত্যা করা হয়।

হাতেগোনা কয়েকজন পালিয়ে গহীন বনের মধ্যে অবস্থিত একটি পুরোনো দুর্গে আশ্রয় নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আবুল হাসানের কন্যাসহ কয়েকজন নারী-পুরুষ এবং মুসলিম শাসকের পাঠানো প্রতিনিধি যুবায়ের। কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও অসহায় নারীদের জন্য মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য আসেনি। মূলত তাদের দুর্দশার কথা মুসলিম শাসকের কানে পৌঁছানোর কোনো উপায়ও ছিল না। তখন অসহায় নারীরা রুমালের ওপর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে যুবায়েরের হাতে তুলে দেন। যুবায়ের বহু বাধা অতিক্রম করে ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে গোপনে চিঠিটি নিয়ে বসরা পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং হাজ্জাজ বিন ইউসুফের হাতে তুলে দেন।

চিঠিটি বারবার পড়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। প্রতিশোধের আগুন তার অন্তরে জ্বলে উঠলেও তিনি তখন অন্য এক চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। তিনি বোখারা আক্রমণ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং সেই পরিস্থিতিতে সিন্ধুর মতো শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত সৈন্য ও অর্থ তার হাতে ছিল না।

তবুও তিনি দমে যাননি। তিনি তাঁর ভাতিজা মুহাম্মদ বিন কাসিম ও যুবায়েরকে দামেস্কে খলিফা ওয়ালিদ ইবনে মালিকের দরবারে পাঠান এবং একটি চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠি পড়ে খলিফা অনুমতি দিতে দেরি করেননি। তবে অধিকাংশ মুসলিম সৈন্য তখন ইরাক, তুর্কমেনিস্তান ও আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধরত ছিল। তাই নতুন অভিযান পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত সৈন্য ছিল না। সে কারণে সৈন্য সংগ্রহের দায়িত্ব মুহাম্মদ বিন কাসিমের ওপর ন্যস্ত করা হয়।

ইতিপূর্বে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মাকরানের শাসনকর্তা মুহাম্মদ ইবনে হারুনের মাধ্যমে ওবায়দুল্লাহর নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাজা দাহিরের নিকট পাঠিয়েছিলেন, যাতে মুসলিম বিধবা নারী ও এতিম শিশুদের মুক্তি এবং জলদস্যুদের বিচার করা হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, ঐ প্রতিনিধি দলের মধ্যে মাত্র দুজন প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিলেন; বাকিদের হত্যা করা হয়। এই সংবাদ প্রতিশোধস্পৃহাকে আরও তীব্র করে তোলে।

অবশেষে মুহাম্মদ বিন কাসিম ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে সিন্ধু অভিমুখে যাত্রা করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার অশ্বারোহী, ৩ হাজার পদাতিক এবং বাকি ৩ হাজার রসদবাহী উটের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এদিকে রাজা দাহিরের কাছে আগেই এই সংবাদ পৌঁছে যায়। তাঁর প্রায় ৭০ হাজার সুপ্রশিক্ষিত সৈন্য তখন দেবল দুর্গে অবস্থান করছিল।

৭১১ সালের মুহাম্মদ বিন কাসিম শিরাজ হয়ে মাকরানে পৌঁছালেন। মাকরানের সীমান্ত অতিক্রম করার সময় লাসবানের পার্বত্যাঞ্চলে তাকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ পাহাড়ের খাজে খাজে সিন্ধু রাজার তীরন্দাজ সৈন্যরা অবস্থান করছিল। এসব বাধা অতিক্রম করে তিনি যাত্রা অব্যাহত রাখেন। এরপর প্রথমেই মুহাম্মদ বিন কাসিম দেবল নগর অবরোধ করেন। তিনি জানিতে পারেন, নগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মন্দিরটির উপর যে বিশাল লাল পতাকাটি বিদ্যমান, তাঁর যাদুশক্তির উপর হিন্দু বাহিনীর প্রবল বিশ্বাস। তাই যদি সেই লাল পতাকাটি ধ্বংস করা যায়, তাহলে এই দুর্গ জয় করা হবে। তাই সেই লাল পতাকাটি ধ্বংস করার জন্য মুহাম্মদ বিন কাসিম সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দেন। কল্পিত তান্ত্রিক পতাকাটির পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেবলের প্রতিরক্ষা বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়। এরপর দেবলে একটি ছোট আকারের সেনাদল রেখে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত বিখ্যাত নগরী নীরনের দিকে যাত্রা করেন। তিনি নীরনের নগরদ্বারে উপস্থিত হইলে বৌদ্ধ পুরোহিতদের একটি দল তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং হাজ্জা নীরন শেহওয়ান বিন ইউসুফ কর্তৃক লিখিত একটি ক্ষমা ও রক্ষা প্রদানকারী পত্র দেখান। সুতরাং কোন রক্তপাত ছাড়াই নগরটি অধিকার করা হয়। এরপর শেহওয়ান জয় করা হয়। শেহওয়ান কোন বাধা প্রদর্শন ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে। শেহওয়ান হতে তিনি সিসামের দিকে অগ্রসর হন এবং জাঠদের বিরোধিতা দমন করেন। ইতিমধ্যে রাজা দাহির ৫০,০০০ অশ্বারোহী বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী সমাবেশ করেন এবং দুর্ভেদ্য রাওয়ার দুর্গে অবস্থান নেয়। মুসলিম বাহিনী এই দুর্গ অবরোধ করে। মুসলিম বাহিনী এই পর্যন্ত যত যুদ্ধ করেছে, তন্মধ্যে এখানে সবচাইতে শক্তিশালী বাহিনীর সম্মুখীন হয়। চারদিন যুদ্ধ চলে, কিন্তু কোন চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া যায় না। পঞ্চম দিন, ১০ই মহরম, চিত্তাকর্ষক এক হস্তীর উপর বসে রাজা দাহির স্বয়ং আক্রমণ পরিচালনা করে। কিন্তু একটা সময় হাতিটি রাজা দাহিরকে তাঁর পিঠ থেকে পেলে দিয়ে পলায়ন করে। তখন সে মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে। এরপর সে একজন আরব সৈন্য কর্তৃক পরাজিত ও নিহত হয়।দাহিরের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রানী বাঈ এবং তার পুত্র অবস্থান নেন রাওয়ার দুর্গের ভেতরে। কিন্তু সেখানও তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারলেন না। অবশেষে দুর্গের পতন হলে তিনি তার পুত্র ও সেবিকাদের নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। রাওয়ার দুর্গ জয়ের মাধ্যমে সমগ্র সিন্ধু মুহাম্মদ বিন কাসিমের আয়ত্তে চলে আসে। কয়েক মাসব্যাপী চলা এই অভিযানে দেবল ও রাওয়ার দুর্গ জয়ের মাঝখানে মুহাম্মদ বিন কাসিমের আরও কয়েকটি শহর জয় করেন, যেমন- ব্রাহ্মণ্যবাদ, বধু, নিরুন, মুলতান ইত্যাদি। মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে সিন্ধু বিজয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। সিন্ধু বিজয়ের পরই অসংখ্য মুসলিম শাসক ভারত অভিযানের সুযোগ পেয়েছেন। সিন্ধু বিজয় ভারতীয় উপমহাদেশ আক্রমণের জন্য মুসলমানদের পথ খুলে দেয়। এজন্য সিন্ধুকে বলা হতো উপমহাদেশের ‘বাবুল ইসলাম’ বা ইসলামের প্রবেশপথ। যদিও মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজিত অঞ্চল মাত্র ৫০ বছর মুসলমানদের অধিকারে ছিল, তারপরেও এ বিজয়ের প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।


বি.দ্র. “এটা আমার বাংলার ইতিহাসের উপর প্রথম লেখা, তাই যদি কোন প্রকার ভুলত্রুটি হয় তাহলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন”

ধন্যবাদ