যেভাবে শহীদ হন ওমর (রা.)।।কে ছিল তাঁর হত্যাকারী।।কি পরিণতি হয়েছিল সেই হত্যা কারীর।।

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) তখন মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলীফা। একদিন তিনি কিছু লোক নিয়ে মদীনার একটি পথ ধরে চলছিলেন। তখন একজন লোককে উমর (রা.)-এর দিকে হাঁটতে আসতে দেখা যায়। সে ছিল মুগীরা ইবনে শু‘বা (রা.)-এর ইরানি গোলাম। তার নাম ছিল আবু লু’লু।

সে হযরত উমর (রা.)-এর নিকট এসে বলল, “আমার মনিব আমার ওপর অনেক বেশি মাশুল আরোপ করে রেখেছে। আপনি তা কমিয়ে দিন।”

হযরত উমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “কত মাশুল?”

আবু লু’লু বলল, “প্রতিদিন দুই দেরহাম।”

হযরত উমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী কাজ কর?”

সে বলল, “আমি ছুতার মিস্ত্রি, ভাস্কর ও কর্মকার।”

হযরত উমর (রা.) বললেন, “তাহলে এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত মাশুল নয়।”

গোলামটি এ জবাব শুনে খুব অসন্তুষ্ট হলো এবং এই বলে চলে গেল যে, “আচ্ছা, বুঝে নেব।”

হযরত উমর (রা.) বললেন, “আমাকে এক গোলাম হুমকি দিল!”

এই বলে তিনি নীরব রইলেন।

কিছুদিন পর আবু লু’লু একটি খঞ্জর তৈরি করল। সেটির হাতল ছিল মাঝখানে, আর ফলা ছিল দুই পাশে। উভয় দিকই ছিল ধারালো। সেই খঞ্জরটি সে পুরো এক মাস বিষের মধ্যে ডুবিয়ে রাখল, যেন সেটি দিয়ে কাউকে আঘাত করলে অল্প আঘাতেই বিষক্রিয়া রক্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং আঘাত সামান্য হলেও আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই না পায়।

এরপর একদিন ফজরের সময় সে মসজিদে এলো।

হযরত উমর (রা.) অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে প্রবেশ করেন এবং মসজিদে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জাগিয়ে দিতে ‘আসসালাত, আসসালাত’ বলতে লাগলেন। জামাতের জন্য মুসল্লিবৃন্দ প্রস্তুত হলেন।

এরপর সকল মুসল্লি কাতারবন্দি হলে আবু লু’লুও মুসল্লিদের সঙ্গে সামনের কাতারে দাঁড়াল।

আমিরুল মুমিনিন উমর (রা.)-কে আঘাত করার জন্য সে দ্বিতীয় রাকাতকে বেছে নিল—যে সময়ে সবার মনোযোগ নামাজে থাকে এবং তার পালিয়ে যাওয়া সহজ হয়।

আমিরুল মুমিনিন উমর (রা.) যখন দ্বিতীয় রাকাত শুরু করলেন এবং সুমধুর কণ্ঠে সূরা ফাতিহা পাঠ করছিলেন—“আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন… ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন”—ঠিক সেই সময় হায়েনার মতো আবু লু’লু উমর (রা.)-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মুহূর্তেই আঘাতের পর আঘাতে তাকে জর্জরিত করে। একটি আঘাত বুকে, আরেকটি পার্শ্বদেশে—এভাবে শরীরের ছয়টি স্থানে সে আঘাত করে।

সবচেয়ে গুরুতর আঘাতটি ছিল তার তলপেটে। নাভির নিচের অংশে পুরো খঞ্জরটি ঢুকিয়ে সে হেঁচকা টানে পেট চিরে ফেলে। জখম এতটাই বড় হয় যে এতে আমিরুল মুমিনিনের অন্ত্রের কিছু অংশ বাইরে বেরিয়ে আসে। তিনি একটি চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

তাকে পাশে রেখে এক সাহাবি সংক্ষিপ্ত সূরা পাঠ করে নামাজ শেষ করেন। এরপর মুসল্লিরা তাকে ধরে ঘরের ভেতরে নিয়ে যান।

যখন উমর (রা.)-এর জ্ঞান ফিরে আসে, তখন তিনি প্রশ্ন করলেন, “মুসল্লিরা কি নামাজ আদায় করতে পেরেছেন? তোমরা কি সালাত আদায় করেছ?”

সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল, “জি, আমিরুল মুমিনিন, আমরা নামাজ আদায় করেছি।”

তাদের জবাব শুনে তিনি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দেয়, ইসলামে তার কোনো অংশ নেই।”

এরপর উপস্থিত ব্যক্তিদের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, “আমাকে আঘাত করেছে কে?”

উপস্থিত একজন উত্তর দিল, “মুগীরা ইবনে শু‘বার দাস অগ্নিপূজক আবু লু’লু আপনাকে আঘাত করেছে।”

একথা শুনে তিনি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। এমন ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে, যে এক আল্লাহর জন্য একটি সিজদাও করেনি।”

তিনি কোনো মুসলিমের হাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হওয়ায় এবং মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণ না হওয়ায় এই শুকরিয়া আদায় করেন।

এরপর একজন চিকিৎসক আসেন। তিনি এক পেয়ালা দুধ এনে উমর (রা.)-কে পান করাতে বললেন। দুধ আনা হলো। তিনি পান করলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা তার ক্ষতস্থান দিয়ে বেরিয়ে এলো।

এভাবে প্রায় তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর (রা.) শাহাদাত বরণ করেন।

তার শাহাদাতে পবিত্র মদীনার নারীরা আক্ষেপ করে বলত, “হায়! আমিরুল মুমিনিনের বদলে যদি আমার সন্তান মারা যেত!”

তার শাহাদাতে আম্মাজান আয়েশা (রা.) এত বেশি কান্না করেন যে ধারণা করা হয়, নিজ পিতার মৃত্যুতেও তিনি এতটা কান্না করেননি।

এখন প্রশ্ন হলো—সে নরাধম আবু লু’লুর ভাগ্যে কী ঘটেছিল?

উমর (রা.)-কে আঘাত করার পর আবু লু’লু পালানোর চেষ্টা করলে কিছু মুসলিম তাকে ধরতে গেলে সে তাদেরও আঘাত করে। এ সময় মোট তেরোজন মুসলিমকে সে আঘাত করে, যাদের মধ্যে সাতজন তৎক্ষণাৎ শাহাদাত বরণ করেন।

তাকে ধরতে অন্যরা পিছু নিলে রক্তাক্ত খঞ্জর হাতে সে ঘুরে দাঁড়ায় এবং কেউ কাছে এলেই আঘাত করতে উদ্যত হয়।

এ সময় এক সাহাবি নিজের গায়ের চাদর খুলে তা ছুড়ে মারেন আবু লু’লুর দিকে। চাদরটি তার শরীরের ওপর পড়ে তাকে জড়িয়ে ফেলে।

সাহাবিরা তখন তার দিকে এগিয়ে যান। আবু লু’লু বুঝে ফেলে যে সে ধরা পড়ে যাচ্ছে এবং আর রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। তখন সে নিজের গলায় সেই বিষাক্ত খঞ্জর চালিয়ে দেয় এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

                                                    ***

হ্যাঁ, তিনি হযরত উমর (রা.)—যার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছিলেন, “আমার পরে যদি কেউ নবী হতো, তবে উমর নবী হতো।”

তিনি সেই উমর (রা.), যিনি নিজে বলেছিলেন, “আমি বেঁচে থাকতে দ্বিন ও ধর্মের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।”

যেই উমর (রা.) যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর বুকে ত্রাস সৃষ্টি করতেন, তাকেই কাপুরুষের মতো পেছন থেকে আঘাত করে হত্যা করা হয়।

মৃত্যুর আলিঙ্গনেও তিনি নিজের এবং গোটা সমাজের নামাজের ব্যাপারে ছিলেন সোচ্চার। ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তেও অন্যকে দ্বিনের ওপর অটল রাখার ফিকিরেই তিনি মগ্ন ছিলেন।

আরো

১.হুনাইনের যুদ্ধঃ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ বৃহত্তর যুদ্ধ

২.ইকরামা রাঃ এর বীরত্বের ইতিহাস