কাকা’ বিন আমর (রা.) ইতিহাস বিখ্যাত অকুতোভয় এক মুসলিম যোদ্ধা

“সৈন্যবাহিনীর মধ্যে ‘কাকা’ বিন আমরের আওয়াজ এক হাজার অশ্বারোহীর থেকেও উত্তম।” — আবু বকর (রা.)

“খালিদের সাথে ‘কাকা’ বিন আমর (রা.)”

আমরা এখন নবম হিজরি থেকে আলোচনা শুরু করব। যে হিজরি সালকে আমরা ‘আমুল ওফুদ’ বা প্রতিনিধি আগমনের বছর নামে জানি। সে বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকটে আরবের বিভিন্ন স্থান থেকে একের পর এক দল আগমন করতে লাগল। পরিস্থিতি এমন হয় যে, প্রতিদিন দুই-তিনটি দল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকটে আগমন করত এবং তারা ইসলামের ঘোষণা দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করত।

সকলের মতো বনু তামীমের লোকেরাও দীর্ঘদিন পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ করতে এলো। তারা সবাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকটে বাইআত গ্রহণ করল এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করল।

কিন্তু তাদের মধ্যে এক যুবকের দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষভাবে নজর পড়ল। রাসূলুল্লাহ (সা.) মনোযোগসহকারে তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁকে নিরীক্ষা করতে লাগলেন। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“যুবকের নাম কী?”

যুবকটি বলল, “’কাকা’ বিন আমর”

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “হে কাকা’! আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য তোমার প্রস্তুতি কী?”

তিনি বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য, শক্তিশালী ঘোড়া এবং তীক্ষ্ণ ধারালো বর্ম।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “এটাই যথেষ্ট।”

ওই দিন থেকেই ‘কাকা’ বিন আমর (রা.) নিজের জান-মাল আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দিলেন এবং ঘোড়ার পিঠকেই নিজের বিছানা বানিয়ে নিলেন। এরই ফলে ইসলামের বীর যোদ্ধা খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

রিদ্দার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর নিকটে আবু বকর (রা.)-এর চিঠি এসে পৌঁছায়। ওই চিঠিতে আবু বকর (রা.) খালিদ (রা.)-কে ইরাক আক্রমণের নির্দেশ দেন। কিন্তু খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর নিকটে তখন সৈন্যসংখ্যা খুবই কম ছিল, কারণ রিদ্দার যুদ্ধে অনেক সৈন্য শহীদ হয়েছিলেন।

তাই তিনি আবু বকর (রা.)-এর নিকটে নতুন সৈন্য চেয়ে চিঠি পাঠালেন। চিঠি পেয়ে আবু বকর (রা.) তাঁর পাশে থাকা লোকদের বললেন,

“খালিদ বিন ওয়ালিদ আমাদের কাছে সাহায্য চেয়েছে। আমরা তাকে ‘কাকা’ বিন আমর (রা.)-এর মাধ্যমে সাহায্য করব।”

এ কথা শুনে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হয়ে গেল। তারা বলল,

“হে আমিরুল মুমিনিন! যার বাহিনী থেকে অধিকাংশ সৈন্য চলে গেছে, তাকে কি মাত্র একজন সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবেন?”

তখন আবু বকর (রা.) বললেন,

“সৈন্যবাহিনীর মধ্যে ‘কাকা’ বিন আমর (রা.)-এর আওয়াজ এক হাজার অশ্বারোহীর থেকেও উত্তম। আর যে বাহিনীতে ‘কাকা’ বিন আমর থাকে, সে বাহিনী কখনো পরাজিত হয় না।”

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) দশ হাজার সৈন্য নিয়ে ইরাকের দিকে রওনা হলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ‘কাকা’ বিন আমর (রা.)। তিনি হাফির নামক এলাকার দিকে অগ্রসর হলেন।

পারস্য সম্রাটের পক্ষ থেকে ওই এলাকার শাসক ছিল হুরমুজ। সে ছিল পারস্যের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। সম্রাটের পর সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির মাথায় যে মুকুট পরানো হতো, তার মূল্য ছিল এক লাখ দিরহাম। হুরমুজের মাথায়ও ছিল সেই মুকুট। তবে আরবরা তাকে ভয়ও পেত, আবার অপছন্দও করত।

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ওই এলাকায় পৌঁছানোর আগেই হুরমুজের কাছে একটি চিঠি পাঠালেন। চিঠিতে লেখা ছিল,

“অতঃপর—তুমি ইসলাম গ্রহণ করো, তাহলে শান্তি পাবে। নতুবা তুমি ও তোমার জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হবে এবং অপমানিত অবস্থায় মুসলমানদের জিজিয়া প্রদান করতে হবে। অন্যথায় সামনে আগত বিপদের জন্য তুমি নিজেই নিজেকে লাঞ্ছিত করবে। কেননা আমি এমন এক জাতিকে নিয়ে এসেছি, যারা মৃত্যুকে ততটাই ভালোবাসে যতটা তোমরা জীবনকে ভালোবাসো।”

হুরমুজ চিঠি পড়ে প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো। সে পারস্য সম্রাট আরদাশিরকে লিখে জানাল যে মুসলমানরা ইরাক আক্রমণ করেছে। চিঠি পেয়ে সম্রাট দ্রুত সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করলেন। তাদের দলে খ্রিষ্টান আরব সৈন্যরাও যোগ দেয়। কাজিমার প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো।

দুই বাহিনী কাতারবদ্ধ হলে হুরমুজ দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানায়। খালিদ (রা.) তা গ্রহণ করেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হুরমুজ ঘোড়া থেকে পড়ে যায় এবং খালিদ (রা.)-কেও নামতে আহ্বান জানায়। বাহ্যত এটি বীরত্ব মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল প্রতারণা। সে আগেই কিছু সৈন্যকে গোপনে প্রস্তুত করে রেখেছিল। হঠাৎ তারা খালিদ (রা.)-কে ঘিরে ধরে তরবারি চালাতে থাকে।

এ সময় আবু বকর (রা.)-এর পক্ষ থেকে প্রেরিত সেই মহান যোদ্ধা ‘কাকা’ বিন আমর (রা.)দ্রুত এগিয়ে এলেন। তিনি বজ্রগতিতে আক্রমণ করে বলতে লাগলেন,

“হে আল্লাহর শত্রু! ‘কাকা’ বিন আমর আসছে! ‘কাকা’ বিন আমর আসছে!”

খালিদ (রা.) তরবারির আঘাতে হুরমুজকে হত্যা করেন। অপরদিকে ক্বা’কাকা’ বিন আমর (রা.) ও অন্যান্য মুসলমান সৈন্য বিশ্বাসঘাতক বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালান। অল্প সময়েই শত্রুরা পরাজিত হয়।

যুদ্ধ শেষে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) বললেন,

“আবু বকর (রা.)-এর জন্য আল্লাহ কল্যাণ দান করুন। তিনি লোকদের আমাকে থেকেও ভালো চিনতেন।”

তিনি আরও বললেন,

“রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খলিফা সত্যই বলেছেন—যে বাহিনীতে ‘কাকা’ বিন আমর (রা.) থাকে, সে বাহিনী কখনো পরাজিত হয় না।”

এরপর থেকে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ‘কাকা’ বিন আমর (রা.)-কে নিজের ডান হাত হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করতেন। তিনি ইয়ারমুকসহ অন্যান্য যুদ্ধে তাঁকে বিশেষ ভূমিকা দেন।

দামেশকের যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ছিলেন চারজন সেনাপতির একজন, যারা আবু উবাইদা বিন জাররাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন। দামেশক ছিল প্রাচীরবেষ্টিত শহর। এর চারদিকে খন্দক খনন করা ছিল এবং পাঁচটি প্রধান ফটক ছিল। দীর্ঘ সাত মাস অবরোধের পর কৌশল ও সাহসিকতার মাধ্যমে মুসলমানরা শহর বিজয় করেন।

পরবর্তীতে খলিফা উসমান (রা.)-এর শাসনামলে সৃষ্ট ফিতনার সময় ‘কাকা’ বিন আমর (রা.) বিদ্রোহ দমনে ভূমিকা রাখেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। গৃহযুদ্ধের পর মুয়াবিয়া (রা.) তাঁকে কিছু সময়ের জন্য নির্বাসনে পাঠান। পরে তিনি কুফায় ফিরে আসেন এবং সেখানেই অবসর জীবনযাপন শেষে ইন্তেকাল করেন বলে বর্ণিত আছে।

**পরবর্তী অন্য কোন পর্বে শিকলের যুদ্ধ নিয়ে লেখা প্রকাশ করা হবে ইনশাল্লাহ**