কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ইসলামের সূচনালগ্নে কে সবচেয়ে বেশি শত্রুতা করেছে, সবাই এক বাক্যে জবাব দেবে আবু জাহেল। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই আবু জাহেলের এক পুত্র ছিল, যে কিনা ইসলামের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। শুনতে অবাক লাগলেও এটি ঐতিহাসিক সত্য। বিখ্যাত এই সাহাবীর নাম ছিল হযরত ইকরামা (রা.)। পিতার নাম অনুসারে তাঁকে ইকরামা ইবনে আবু জাহেল নামেও ডাকা হয়। ইসলামের ইতিহাসে ইকরামা (রা.) এমন এক চরিত্র, যিনি প্রথম দিকে ছিলেন ইসলামের চরম শত্রু। কিন্তু পরে তিনি ইসলামের ছায়াতলে নিজেকে সমর্পণ করেন। একজন পাক্কা খলনায়ক থেকে কিভাবে তিনি একজন সত্যিকারের নায়ক হয়ে উঠলেন, তা আজ এখানে আলোচনা করা হবে।
ইসলামের জন্মলগ্ন থেকে যারা ইসলামের বিরোধিতা করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল আবু জাহেল। সে ছিল তৎকালীন মক্কার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। মক্কার লোকজন তাকে সম্মান করে ডাকত আবু আল-হাকাম, অর্থাৎ জ্ঞানীদের পিতা। কিন্তু মহানবী (সা.) তাঁর নাম দিয়েছিলেন আবু জাহেল, অর্থাৎ মূর্খদের পিতা। পরবর্তীতে এই ঘৃণিত নামেই সে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। এদিকে ইকরামা তাঁর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকে।
২য় হিজরির ১৭ই রমজান, মদিনা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে বদরের ময়দানে মুসলিম ও কুরাইশরা প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়। আর এখানে কুরাইশদের নেতা ছিল সেই ঘৃণিত আবু জাহেল। পিতার সাথে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ইকরামা। তাঁর ইচ্ছা ছিল রাসুল (সা.)-এর মাথা কেটে এনে তাঁর পিতার পায়ের সামনে রেখে দেবে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। মুসলিম বাহিনীর চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় হয় কুরাইশ বাহিনীর। আর এই বদরের যুদ্ধেই নিহত হয় অভিশপ্ত আবু জাহেল। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে পিতার লাশ রেখে পালাতে বাধ্য হয় ইকরামা। তাঁর ভাগ্যে পিতার লাশ দাফন করাও জোটেনি।
আবু জাহেলের মৃত্যুর পর মক্কার নেতৃত্ব গ্রহণ করে আবু সুফিয়ান। তাঁর নেতৃত্বে পরের বছর আবার মদিনা আক্রমণ করে কাফেররা। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে এই বাহিনীতে যোগ দেয় ইকরামা। কিন্তু এবারও মুসলিম বাহিনীর প্রথম ধাক্কায় পিছু হটতে বাধ্য হয় মক্কার কাফেররা। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর ভুলের কারণে মুসলিম বাহিনীর পেছন থেকে হামলা চালায় খালিদ বিন ওয়ালিদ ও তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী, আর তাকে অনুসরণ করে হামলা চালায় ইকরামা। হঠাৎ এই আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে মুসলিম বাহিনী, নেমে আসে বিপর্যয়। অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে রাসুলুল্লাহ (সা.) গুরুতর আহত হন। ময়দানে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) শহিদ হয়েছেন। এ খবর শুধু মক্কা থেকে আগত কাফেররাই নয়, এমনকি অনেক মুসলিমও বিশ্বাস করেছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বাঁচিয়ে নিলেও সেদিন ওহুদের ময়দানে শহিদ হন ৭০ জন সাহাবি। রাসুল (সা.) হারিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় চাচা হামজা (রা.)-কে।
ওহুদের যুদ্ধের দুই বছর পর ১০ হাজার সেনার বিশাল বাহিনী নিয়ে আবার মদিনা আক্রমণ করে মক্কার কাফেররা। এদিকে মদিনাকে রক্ষা করতে মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করে তার ভেতরে অবস্থান নেন রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা। পরিখা পার হয়ে মদিনায় আক্রমণ চালাতে ব্যর্থ হয়ে তারা মদিনা অবরোধ করে। প্রায় ২৭ দিন অবরোধ শেষে প্রবল মরুঝড় ও শীতের কারণে তারা অবরোধ তুলে নিয়ে মক্কায় ফিরে যায় কাফেররা। কিন্তু অবাক করার ব্যাপার হলো, এখানেও ইকরামা বীরত্ব প্রদর্শন করে। মদিনার চারপাশে যে পরিখা খনন করা হয়েছিল, তার এক জায়গায় পরিখাটি একটু কম প্রশস্ত ছিল, যেখান দিয়ে ঘোড়া লাফ দিয়ে পার হওয়া যেত, আর সেটি ইকরামার চোখে পড়ে। সে ও আরও কয়েকজন লোক পরিখা পার হয়। আমর বিন আব্দুল উদ্দ আল-আমিরী দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানালে সে হযরত আলী (রা.)-এর হাতে নিহত হয়। তখন হযরত ইকরামা মৃত্যুভয়ে পালিয়ে যায়।
সত্যধর্মের বিরোধিতায় ইকরামার অবস্থান কতটা কঠোর ছিল, তা বোঝা যায় মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর কার্যকলাপ দেখে। হিজরতের ৮ বছর পর যখন রাসুল (সা.) বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন, তখন পথে বাধা দেওয়ার দুঃসাহস কারও ছিল না। এমনকি আবু জাহেলের মৃত্যুর পর যিনি মক্কার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সেই আবু সুফিয়ানও মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ শুনে গোপনে মুসলিম শিবিরে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, এখানেও ইকরামা তাঁর ভয়ানক দুঃসাহস দেখায়। সে তার কিছু সাথী নিয়ে মুসলিম বাহিনীর পথ আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁর ভাগ্য এবারও নেহাতই খারাপ ছিল। যে পথে সে মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে দাঁড়িয়েছিল, সেই পথেই ঝড়ের গতিতে এগিয়ে আসছিল একদল মুসলিম, আর তাদের নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-ও একসময় ইকরামার মতো ইসলামের শত্রু ছিলেন, কিন্তু কয়েক বছর আগে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসুল (সা.)-এর প্রিয় সাহাবিতে পরিণত হন। ইকরামার জন্য আফসোসের বিষয় ছিল এই যে, অন্য কোনো মুসলিম কমান্ডারের নয়, স্বয়ং তাঁর প্রিয় বন্ধু খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর হাতেই চরমভাবে পরাজিত হয়ে তাকে পালাতে হয়।
কিন্তু ইকরামা (রা.) ছিলেন একজন ভাগ্যবান স্বামী। তাঁর স্ত্রী উম্মে হাকীম রাসুল (সা.)-এর কাছে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর স্বামীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপর রাসুল (সা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এ খবর যখন পলাতক ইকরামার কানে যায়, সে প্রথমে তা বিশ্বাস করতে পারেনি। সে মনে মনে ভাবল—এটা কিভাবে সম্ভব? যেখানে আমি ও আমার পিতা সারা জীবন তাঁর বিরোধিতা করেছি, তাঁর ও তাঁর সাথীদের ওপর নির্যাতন করেছি, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি, এখন তিনি কিভাবে আমাকে ক্ষমা করতে পারেন? এসব চিন্তা তাঁর মনে পরিবর্তন এনে দেয়। অতঃপর সে চলে যায় রাসুল (সা.)-এর কাছে।
সেখানে গিয়ে ইকরামা (রা.) বলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি সেই ব্যক্তি, যে ভুলের মধ্যে ছিলাম এবং এখন অনুশোচনায় কাতর। আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।” আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এমনকি তিনি ইকরামার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করে বলেন, “হে আল্লাহ! তুমি তাকে মাফ করে দাও। সে আমার যত বিরুদ্ধাচরণ করেছে, তোমার নূরকে নিভানোর জন্য যত সফর করেছে এবং আমার সামনে বা পেছনে আমার বিরুদ্ধে যত কিছু করেছে—সব কিছুর জন্য তাকে মাফ করে দাও।”
এতে তাঁর চেহারায় আনন্দ ফুটে ওঠে। তখন ইকরামা (রা.) বলেন, “আল্লাহর শপথ! আমি যা কিছু আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ আল্লাহর দ্বীনের জন্য ব্যয় করব এবং আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে যত যুদ্ধ করেছি, তার দ্বিগুণ আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে যুদ্ধ করব।”
এই দিন থেকেই তিনি দাওয়াতের মিছিলে প্রবেশ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন যুদ্ধের ময়দানে দুঃসাহসী অশ্বারোহী, মসজিদে সর্বাধিক ইবাদতকারী, রাত্রি জাগরণকারী ও আল্লাহর কিতাব পাঠকারী। এমনকি রাসুল (সা.)-এর মৃত্যুর পর যখন আবু বকর (রা.) খলিফা হন, তখন দিকেদিকে ভণ্ড নবী ও বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যদিও আবু বকর (রা.) কঠোর হস্তে তাদের দমন করেন। সে সময় তিনি পুরো মুসলিম বাহিনীকে ১১টি ভাগে ভাগ করেন, আর ইকরামা (রা.) ছিলেন সেই ১১টি বাহিনীর একটির সেনাপতি।
এরপর ওমর (রা.)-এর শাসনামলে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিমরা একের পর এক রাজ্য জয় করে ইসলামী সাম্রাজ্য প্রসারিত করতে থাকে।
এই সময় মুসলিম ও রোমানদের মধ্যে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ইয়ারমুকের যুদ্ধ। উল্লেখ্য, রোমান সাম্রাজ্য ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক শক্তিশালী রাষ্ট্র। আর মুসলিমরা এর আগেই কয়েকটি যুদ্ধে রোমানদের পরাজিত করেছিল। এরই প্রতিশোধ নিতে পুরো সাম্রাজ্য থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে রোমান সম্রাট, যার সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৫০,০০০। এই যুদ্ধে নিজের জীবন দিয়ে এক মহানায়কে পরিণত হন ইকরামা (রা.)।
ইয়ারমুকের দিন ইকরামা (রা.) তীব্রভাবে শত্রুর ওপর আক্রমণ করেন। যখন যুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, তিনি তাঁর তরবারি খাপমুক্ত করেন এবং বীরবিক্রমে শত্রুদের ভেতরে ঢুকে পড়েন। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) তাঁকে বললেন, “হে ইকরামা! তুমি এটি করবে না, কেননা তুমি শহিদ হলে যুদ্ধ মুসলমানদের জন্য আরও কঠিন হয়ে যাবে।”
ইকরামা (রা.) বললেন, “হে খালিদ! আমাকে আমার কাজ করতে দাও। কেননা তোমরা আমার অনেক আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছ। আর আমি ও আমার পিতা রাসুল (সা.)-এর তীব্র বিরোধিতা করেছি। সুতরাং আমাকে ছেড়ে দাও, আমি আমার আগের কর্মের কাফফারা আদায় করে নিই। আমি রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধেও কত যুদ্ধ করেছি, আর আজ তাঁর পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমি কি পালিয়ে যাব? না, তা কখনো হতে পারে না।”
এরপর তিনি তাঁর অধীনস্থ চারশত সেনার উদ্দেশ্যে বললেন, “কে কে আমার হাতে মৃত্যুর জন্য বাইআত নেবে?” তাঁর এই আহ্বানে এগিয়ে আসে চারশত মর্দে মুজাহিদ। তাঁরা সবাই মিলে শত্রুদের ওপর তীব্র আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যা খালিদ (রা.) কল্পনাও করতে পারেননি।
যুদ্ধ শেষে ইয়ারমুকের ময়দানে ওই চারশত মর্দে মুজাহিদের মধ্যে অল্প কয়েকজন বাদে সবাই আঘাতে আঘাতে দুর্বল হয়ে মাটিতে পড়ে থাকেন। তাদের মধ্যে হারিসা বিন হিশাম (রা.) “পানি, পানি” বলে আওয়াজ দেন। যখন তাঁর কাছে পানি আনা হয়, তখন ইকরামা (রা.) পানি বলে আওয়াজ দেন। এতে হারিসা (রা.) বলেন, “তোমরা তাকে আগে পানি দাও।”
যখন ইকরামা (রা.)-এর কাছে পানি নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আয়াস বিন আবু রাবিয়া (রা.) পানি বলে আওয়াজ দেন। তাঁর আওয়াজ শুনে ইকরামা (রা.) বলেন, “তোমরা তাকে আগে পানি দাও।” কিন্তু আয়াস (রা.)-এর কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি শহিদ হন। এরপর তারা ইকরামা ও হারিসা (রা.)-এর কাছে পানি নিয়ে ফিরে আসে, কিন্তু ততক্ষণে তাঁরা দুজনই শাহাদাত বরণ করেছেন।
ইকরামা (রা.) সত্যিই ঈমান এনেছেন কি না—এ নিয়ে অনেকেই সন্দেহ করত। তারা ভাবত, তিনি মক্কা বিজয়ের পর বিপদের মুখে পড়ে ঈমান এনেছেন। এমনকি ওমর (রা.)-ও তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখতেন।
মৃত্যুর আগে ইকরামা (রা.) খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে বলেছিলেন, “ইবনে হানযালা [ওমর (রা.)] বলেছিলেন, আমরা শহিদ হব না—তা সঠিক নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শাহাদাত দান করেছেন।”
এভাবেই ইকরামা (রা.) তাঁর জীবনে কৃত অপরাধের মূল্য পরিশোধ করেন। আল্লাহ যেন তাঁদেরকে হাউজে কাউসারের পানি পান করান, যে পানি পান করলে আর কখনো পিপাসা লাগবে না, এবং তাঁদেরকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।