যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা বিজয় করেন, তখন তাঁর এই বিশাল বাহিনীকে মোকাবিলা করার শক্তি মক্কা বা তাদের প্রতিবেশী গোত্রসমূহের ছিল না। এ কারণে শক্তিশালী, অহংকারী ও উচ্ছৃঙ্খল কিছু গোত্র ছাড়া অন্য সবাই আত্মসমর্পণ করেছিল। উচ্ছৃঙ্খল গোত্রসমূহের মধ্যে হাওয়াযেন ও ছাকিফ ছিল সবার আগে। তাদের সঙ্গে আরও কিছু গোত্রের লোকজনও শামিল হয়েছিল। মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ করাকে তারা আত্মমর্যাদার পরিপন্থী মনে করছিল। তাই তারা মালেক ইবনে আওফ নাসরীর কাছে গিয়ে মুসলমানদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নিল।
সিদ্ধান্তের পর মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে মালেক ইবনে আওফের নেতৃত্বে সমবেত সকল অমুসলিম রওয়ানা হলো। তারা নিজেদের পরিবার-পরিজন ও গবাদিপশু সঙ্গে নিয়ে চলল—এই কারণে যে, প্রত্যেক যোদ্ধা তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও গবাদিপশুর আকর্ষণে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করবে।
তারা আওতাস প্রান্তরে উপস্থিত হলো। আওতাস হচ্ছে হোনায়েনের নিকটবর্তী বনু হাওয়াযেন এলাকার একটি প্রান্তর। তবে এ প্রান্তরটি হোনায়েন থেকে পৃথক। এটি যুল মাজাজের সন্নিকটে অবস্থিত। সেখান থেকে আরাফাত হয়ে মক্কার দূরত্ব দশ মাইলেরও বেশি।
আওতাসে অবতরণের পর লোকেরা কমান্ডার মালেক ইবনে আওফের সামনে হাজির হলো। এদের মধ্যে প্রবীণ সমরবিশারদ দুরাইদ ইবনে ছোম্মাও ছিলেন। তিনি বার্ধক্যের কারণে ন্যুব্জ ছিলেন। বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। একসময় তিনি ছিলেন বীর যোদ্ধা। এখন অভিজ্ঞতা বর্ণনা ও সে অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়া ছাড়া তাঁর আর কিছু করার ছিল না। তিনি মালেককে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমরা কোন প্রান্তরে রয়েছ?”
বলা হলো, “আওতাস প্রান্তরে।”
তিনি বললেন, “এটি সৈন্য সমাবেশের উপযুক্ত জায়গা।”
হাওয়াযেনদের এই রণপ্রস্তুতির সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু হাদরাদ আসলামী (রা.)-কে কৌশলে তাদের ভেতরে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করে আসতে পাঠালেন। হযরত আবদুল্লাহ (রা.) তাদের ভেতরে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করে এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জানালেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) হাওয়াযেনদের মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এই সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলো যে, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কাছে প্রচুর অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু সাফওয়ান তখনও মুশরিক ছিলেন। তার কাছে লোক পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম ধার চাইলেন।
সাফওয়ান জিজ্ঞেস করল,
“মুহাম্মদ, তুমি এগুলো কেড়ে নিচ্ছ নাকি?”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন,
“না, ধার নিচ্ছি এবং গ্যারান্টি দিচ্ছি যে এগুলো তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে।”
সে বলল, “আমার কোনো আপত্তি নেই।”
অতঃপর সে একশত বর্ম এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক অস্ত্র ধার দিল। কথিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে ওইসব অস্ত্র পরিবহনের ব্যবস্থাও করতে অনুরোধ করেছিলেন এবং সে যথাযথভাবে তার ব্যবস্থাও করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কাছ থেকে অস্ত্রসহ একশত বর্ম ধার নিলেন এবং হযরত আত্তাব ইবনে আসিদ (রা.)-কে মক্কার গভর্নর নিযুক্ত করলেন।
অষ্টম হিজরির ৬ই শাওয়াল, রবিবার, রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে হোনায়েনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। এটি ছিল মক্কা বিজয়ের উনিশতম দিন। তাঁর সঙ্গে ছিল ১২,০০০ সৈন্য। এদের মধ্যে ১০,০০০ মদীনা থেকে মক্কায় এসেছিলেন এবং বাকি ২,০০০ মক্কা থেকে রওয়ানা হন। মক্কার এই ২,০০০ সৈন্যের অধিকাংশই ছিলেন নওমুসলিম।
দুপুরের পর একজন সাহাবি এসে বললেন,
“আমি অমুক অমুক পাহাড়ে উঠে দেখেছি, হাওয়াযেনরা সপরিবারে যুদ্ধ করতে এসেছে। এমনকি তারা তাদের গবাদিপশুও সঙ্গে এনেছে।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) হেসে বললেন,
“ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল এগুলো মুসলমানদের গনীমতের মাল হবে।”
কিছু মুসলিম সৈন্য সংখ্যার আধিক্য দেখে বললেন,
“আমরা আজ কোনোভাবেই পরাজিত হব না।”
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের এ কথাটি পছন্দ করলেন না।
১০ই শাওয়াল, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ইসলামী বাহিনী হোনায়েনে পৌঁছাল। মালেক ইবনে আওফ আগেই সেখানে পৌঁছে রাতের অন্ধকারে তার সৈন্যদের বিভিন্ন স্থানে গোপনে ছড়িয়ে রেখেছিল। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—মুসলমানরা আসামাত্র তাদের ওপর তীর নিক্ষেপ করবে এবং এরপর একযোগে হামলা চালাবে।
এদিকে খুব প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (সা.) সৈন্যদের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করলেন। খুব ভোরে মুসলিম সৈন্যরা হোনায়েনের প্রান্তরে পদার্পণ করল। শত্রুসৈন্য সম্পর্কে তারা কিছুই জানত না। শত্রুরা যে ওঁত পেতে রয়েছে, এ বিষয়ে অনবহিত মুসলমান সৈন্যরা নিশ্চিন্তে অবস্থান নেওয়ার সময় হঠাৎ তাদের ওপর তীরবৃষ্টি শুরু হলো।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো—কাফির পক্ষের তিরন্দাজরা ছিল অদক্ষ। মুসলমানদের দিকে নিক্ষিপ্ত অধিকাংশ তীরই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং যেগুলো লক্ষ্যভেদ করেছিল, আল্লাহর রহমতে তাতেও মুসলমানদের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি।
এতে নওমুসলিমদের অনেকেই পিছু হটতে শুরু করেন। আবার তাদের পশুগুলিও ছোটাছুটি করতে থাকে।
সাহাবিরা ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) উচ্চস্বরে আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“হে লোকসকল! তোমরা আমার দিকে এসো। আমি আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।”
সেই সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে কয়েকজন মুহাজির ও তাঁর বংশের সাহাবি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।
সেই নাজুক মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.) নজিরবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি শত্রুদের দিকে অগ্রসর হতে হতে উচ্চস্বরে বলছিলেন,
“আন্নাবিয়্যু লা কাজিব, আনা ইবনু আবদুল মুত্তালিব।”
অর্থাৎ, আমি নবী, আমি মিথ্যাবাদী নই; আমি আবদুল মুত্তালিবের পুত্র।
সেই সময় আবু সুফিয়ান ও হযরত আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খচ্চর ধরে রেখেছিলেন, যাতে তা সামনের দিকে দ্রুত এগিয়ে না যায়। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)-কে বললেন যেন তিনি লোকদের উচ্চস্বরে ডাকতে শুরু করেন।
হযরত আব্বাস (রা.)-এর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত জোরালো। তিনি তখন উচ্চস্বরে বললেন,
“কোথায় তোমরা বৃক্ষওয়ালা, বাইআতে রিদওয়ানকারীরা?”
তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে সাহাবিরা এমনভাবে ছুটে আসতে লাগলেন, যেমন গাভীর ডাক শুনে বাছুর ছুটে আসে। সাহাবিরা বলতে লাগলেন,
“আমরা আসছি, আমরা আসছি।”
সাহাবিরা ছুটে এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চারদিকে সমবেত হলে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলো। যারা যেভাবে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেছিলেন, সেভাবেই দ্রুত ফিরে আসতে লাগলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) একমুঠো ধুলো তুলে ‘শাহাতিল উজূহ’ বলে শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। এর অর্থ—চেহারা বিকৃত হোক। সেই ধুলো নিক্ষেপের ফলে প্রত্যেক শত্রুর চোখ ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তারা তখন প্রাণ বাঁচাতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালাতে শুরু করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ধুলো নিক্ষেপের পরই যুদ্ধের চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। শত্রুরা পরাজিত হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ সংঘর্ষ চলার পর মুশরিকরা পালিয়ে যায়। পরাজয়ের পর একদল শত্রু তায়েফের পথে, একদল নাখলার দিকে এবং আরেকদল আওতাসের পথে অগ্রসর হয়।
এই যুদ্ধে সাহাবিদের মধ্যে হযরত আবু আমির আশআরী (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। তিনি একটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। একদল সাহাবি নাখলার পথে পলায়নরত অমুসলিমদের ধাওয়া করেন। দুরাইদ ইবনে ছোম্মাকে ধরে ফেললে হযরত রাবিয়া ইবনে রফি (রা.) তাকে হত্যা করেন।
যুদ্ধ শেষে শত্রুদের সঙ্গে আনা অস্ত্র, ধনসম্পদ, রসদ, সামগ্রী, নারী, শিশু ও পশুপাল—সবকিছুই মুসলমানদের হস্তগত হয়।
পরাজিত শত্রুদের সবচেয়ে বড় দল তায়েফের দিকে অগ্রসর হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) গনীমতের মাল সংগ্রহ করার পর তায়েফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
এই যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন কাফির নিহত হয় এবং প্রায় ৬,০০০ জন বন্দি হয়। আর মুসলমানদের পক্ষে মাত্র কয়েকজন শহিদ হন।