হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.) যখন উসামা বাহিনীকে সিরিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন, তখন তিনি ইরানিদের ব্যাপারেও গাফিল ছিলেন না। তিনি এই ভয়াবহ অবস্থা ও দুশ্চিন্তাপূর্ণ সময়ে—যখন স্বয়ং মদীনা মুনাওয়ারার নিরাপত্তা এবং আরবের বিভিন্ন প্রদেশে মুরতাদ সমস্যার কারণে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন ছিল অপরিসীম—উপরোক্ত এগারোটি বাহিনী প্রেরণের পূর্বেই একটি ক্ষুদ্র বাহিনী মুছান্না ইবন হারিছা শায়বানী (রা.)-এর নেতৃত্বে ইরাকে প্রেরণ করেছিলেন।
তিনি মুছান্নাকে এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, ইরাকে পৌঁছে কোনো স্থানেই স্থির হয়ে যুদ্ধ শুরু করবে না; বরং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ইরাকি সরদারদের সন্ত্রস্ত করে রাখবে। এর মাধ্যমে আবু বকর (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল—যতক্ষণ পর্যন্ত আরবের মুরতাদ সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দমন না হবে, ততক্ষণ যেন ইরানিরা আরব আক্রমণ করার সাহস না পায় এবং মুসলমানদের অস্থিরতা ও দুর্বলতার বিষয়টি পুরোপুরি জানতে না পারে।
একই উদ্দেশ্য তিনি উসামা বাহিনীর মাধ্যমেও অর্জন করতে চেয়েছিলেন—অর্থাৎ রোমকরা যেন আরব আক্রমণ করার দুঃসাহস না করে।
নজদ ও ইয়ামামার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবু বকর (রা.) নজদে অবস্থানরত আয়ায ইবন গানাম (রা.)-কে লিখে পাঠান:
“যেসব মুসলমান মুরতাদ হয়নি এবং ইসলামের ওপর অবিচল রয়েছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে ইরাকে আক্রমণ করো।”
এবং ইয়ামামায় অবস্থানরত হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা.)-কে লিখে পাঠান:
“তুমি তোমার বাহিনীসহ ইরাকে গমন করো।”
পথিমধ্যে বিভিন্ন গোত্রনেতা এবং তাদের প্রত্যেকের দুই হাজার যোদ্ধা খালিদের বাহিনীতে যোগ দেয়। ফলে বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮,০০০ জন।
আবু বকর (রা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী ‘উলা’ নামক স্থানে হযরত মুছান্না ইবন হারিছা (রা.) ও হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা.) পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হন।
এর পূর্বে হযরত খালিদ (রা.) পারস্য সীমান্তবর্তী দাস্ত মাইসানের গভর্নর হরমুজকে একটি চিঠি লিখে পাঠান। তাতে লেখা ছিল:
“ইসলাম গ্রহণ করুন এবং নিরাপদ থাকুন। অথবা জিজিয়া দিতে সম্মত হন, তাহলে আপনি ও আপনার জনগণ আমাদের নিরাপত্তায় থাকবে। নতুবা পরিণামের দায়িত্ব আপনারই, কারণ আমি এমন লোকদের নিয়ে এসেছি যারা মৃত্যুকে ততটাই ভালোবাসে, যতটা আপনারা জীবনকে ভালোবাসেন।”
চিঠিটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ তা পারস্যের রাজদরবারে পাঠিয়ে দেয় এবং নিজেও সৈন্য সমাবেশ করে হযরত খালিদ (রা.)-এর মোকাবিলায় অগ্রসর হয়।
এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য খালিদ (রা.)-কে তাঁর কৌশল বাস্তবায়নে সহায়তা করেছিল। উবালা যাওয়ার দুটি পথ ছিল—একটি কাজিমা হয়ে, অন্যটি হুফাইর হয়ে। হরমুজ ধারণা করেছিল, খালিদ (রা.) ইয়ামামা থেকে কাজিমা হয়ে উবালায় আসবেন। এই ধারণা থেকে সে উবালা থেকে সরাসরি কাজিমার দিকে অগ্রসর হয়।
কিন্তু খালিদ (রা.) সরাসরি কাজিমার পথে না গিয়ে কৌশলে হুফাইরের দিকে অগ্রসর হন। এদিকে হরমুজ যখন কাজিমায় সৈন্য সমাবেশ করল, তখন তার গুপ্তচর এসে খবর দিল যে খালিদ (রা.) হুফাইরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, উবালা থেকে হুফাইরের দূরত্ব ছিল ২১ মাইল। ফলে উবালা শহরটি প্রায় অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এটি পারস্য সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হওয়ায় একে রক্ষা করা হরমুজের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
এই সংবাদে হরমুজ তড়িঘড়ি করে প্রায় ৫০ মাইল অতিক্রম করে হুফাইরের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু সেখানে গিয়েও সে মুসলিম বাহিনীর সন্ধান পায় না। তখন আবার গুপ্তচর এসে খবর দেয়—খালিদ (রা.) হুফাইর থেকে কাজিমার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
এই খবর শুনে হরমুজ আবার দ্রুতগতিতে প্রায় ৫০ মাইল অতিক্রম করে কাজিমার দিকে ফিরে আসে। এভাবে তিন দফায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পারস্য বাহিনী চরমভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
পারস্য সেনাবাহিনী ছিল তৎকালীন অন্যতম শক্তিশালী ও অস্ত্রসমৃদ্ধ বাহিনী। তবে দ্রুতগামী হওয়ার ক্ষেত্রে তারা দুর্বল ছিল। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ায় তারা দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে পারত না, উপরন্তু তাদের ঘোড়া ও উটের সংকট ছিল। অন্যদিকে খালিদ (রা.)-এর বাহিনী ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট এবং প্রায় সব সৈন্যই ঘোড়া বা উটে আরোহী ছিল।
হরমুজ কাজিমায় পৌঁছে খালিদ (রা.)-এর বাহিনীর মুখোমুখি হয়। সে তার বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত করে। পার্শ্ববাহিনীর নেতৃত্বে ছিল কুবাজ ও আনোশাগান। সৈন্যরা যাতে পরাজয়ের সময় পালাতে না পারে, সে জন্য তারা নিজেদের পায়ে শিকল বেঁধে নেয়। এতে অশ্বারোহী আক্রমণ প্রতিহত করার সুবিধা হলেও প্রয়োজনে পিছু হটার সুযোগ তারা হারায়।
হরমুজ কাজিমার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থান নেয়। খালিদ (রা.) পেছনে মরুভূমি রেখে অবস্থান গ্রহণ করেন, যাতে প্রয়োজনে পশ্চাদপসরণ করা যায়।
দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা.) হরমুজকে একক দ্বন্দ্বে আহ্বান জানান। হরমুজ সেই আহ্বানে সাড়া দেয়। দুজন ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ শুরু করেন। এক পর্যায়ে খালিদ (রা.)-এর আঘাতে হরমুজ মাটিতে পড়ে যায়। এরপর সে খালিদ (রা.)-কে ঘোড়া থেকে নেমে যুদ্ধ করার আহ্বান জানায়।
বাহ্যিকভাবে এটি সাহসিকতার পরিচয় মনে হলেও হরমুজের মনে ছিল এক ভয়ংকর কুটচক্রান্ত। যুদ্ধের আগে সে কয়েকজন দক্ষ সৈন্যকে গোপনে প্রস্তুত রেখেছিল, সংকেত পেলেই যারা খালিদ (রা.)-কে ঘিরে ধরে হত্যা করবে।
এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞ খালিদ (রা.) ঘোড়া থেকে নেমে পদাতিক হিসেবে যুদ্ধ শুরু করেন। উভয়ের মধ্যে তীব্র আঘাত-পাল্টা আঘাত চলতে থাকে। একপর্যায়ে হরমুজ ঢাল ও তলোয়ার ফেলে কুস্তির আহ্বান জানায়। কুস্তি শুরু হলে হঠাৎ সেই নির্বাচিত সৈন্যদল খালিদ (রা.)-কে ঘিরে ফেলে।
এই দৃশ্য দেখে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, কারণ খালিদ (রা.) তখন নিরস্ত্র ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী থেকে এগিয়ে আসেন বীর সাহাবি কা‘কা‘ ইবন আমর (রা.)। তিনি একাই সেই সৈন্যদলের ওপর আক্রমণ করেন। হরমুজের কুটচক্রান্ত ব্যর্থ হয় এবং খালিদ (রা.) এক আঘাতে হরমুজকে হত্যা করেন।
এরপর খালিদ (রা.) সম্মিলিত আক্রমণের নির্দেশ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পারস্য বাহিনী ভেঙে পড়ে এবং পালাতে শুরু করে। কিন্তু যেসব সৈন্য শিকলে আবদ্ধ ছিল, তারা পালাতে না পেরে ব্যাপকভাবে নিহত হয়।
হরমুজের পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্র খালিদ (রা.)-এর হস্তগত হয়। তার এক লক্ষ দিরহাম মূল্যের মুকুটও খালিদ (রা.) লাভ করেন।
এই যুদ্ধে পারস্য সেনাবাহিনীর সামনের অংশ পায়ে শিকল বেঁধে নিয়েছিল, যাতে তারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে না পারে। কিন্তু সেই শিকলই শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা.) মুছান্না ইবন হারিছা (রা.)-কে পারস্য বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনের জন্য পাঠান। মুছান্না (রা.) অগ্রসর হয়ে হিসল মারাআত দুর্গ অবরোধ করেন এবং তা জয় করেন। সেখানকার শাসনকর্তা নিহত হয়। তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুছান্না (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
আরও পড়ুন
১.কাদিসিয়ার যুদ্ধঃ কাকা’ বিন আমর (রা.) এর বীরত্বগাঁথা এক যুদ্ধ
২.ইকরামা রাঃ এর বীরত্বের ইতিহাস
৩.হুনাইনের যুদ্ধঃ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ বৃহত্তর যুদ্ধ