খায়বারের যুদ্ধঃ হযরত আলীর বীরত্বমাখা এক যুদ্ধ

সিরিয়ার প্রান্তরে এক বিশাল শ্যামল ভূখণ্ডের নাম ছিল খায়বার। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বহু দুর্গ দ্বারা এই স্থানটি সুরক্ষিত ছিল। এখানে আগে থেকেই ইহুদিদের বসতি ছিল। মদিনা থেকে বহিষ্কৃত ইহুদি গোত্র বনু কাইনুকা ও বনু নাজিরের লোকেরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। আর মদিনা থেকে বিতাড়িত ইহুদীরা যে শান্তশিষ্ট ও সুবোধ বালকের মতো এখানে বসে থাকবে না, তা সকলেই জানত। তাদের অন্তরে ছিল গভীর দুরভিসন্ধি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মুসলমানদের প্রতি তাদের জাতিগত ক্রোধ তো ছিলই, পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যও তারা গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল মুসলমান ও মক্কার কাফেরদের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে উভয় পক্ষকে দুর্বল করে ফেলা এবং সেই সুযোগে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করা। তারা সেই চেষ্টাও করেছিল। খন্দকের যুদ্ধে তারা কাফেরদের সাহায্য করে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালায়।

তাছাড়া ইহুদীরা ছিল মুসলমানদের জন্মলগ্নের শত্রু। অন্যদিকে মুসলমান ও মক্কার কাফেরদের মধ্যে দশ বছরের জন্য হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হয়েছিল। ফলে আরব উপদ্বীপে তখন মুসলমানদের একমাত্র প্রকাশ্য শত্রু ছিল এই ইহুদীরা।

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সকল ষড়যন্ত্রের মূল ঘাঁটি খায়বরের ইহুদীদের বিরুদ্ধে এই অভিযান পরিচালিত হয়।

৭ম হিজরির মুহাররম মাসে, অর্থাৎ ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে মুসলমানরা খাইবার অভিযানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। হুদাইবিয়ার সন্ধি ও বাই‘আতে রিদওয়ানে উপস্থিত ১৪০০ সাহাবিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং এই অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁদের সঙ্গে ১০০ থেকে ২০০টি ঘোড়া ছিল। এ অভিযানে কিছুসংখ্যক মহিলা সাহাবিয়াও অংশ নেন, যারা আহতদের সেবা-যত্নে নিয়োজিত ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এ যুদ্ধে কোনো মুনাফিককে অন্তর্ভুক্ত করেননি। কারণ মুনাফিকদের সঙ্গে ইহুদীদের সখ্যতা ছিল বহু পুরোনো। তারা যুদ্ধে গেলে ইহুদীদের স্বার্থেই কাজ করত, যা মুসলিম বাহিনীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতো।

এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খায়বর অভিযানের গোপন খবর মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই আগেভাগেই ইহুদীদের জানিয়ে দেয় এবং তাদের কাছে পত্র পাঠায়। এতে তাদের যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করা হয় এবং বলা হয়, “তোমরা অবশ্যই জয়ী হবে। কারণ মুহাম্মাদের লোকসংখ্যা খুবই কম এবং তারা প্রায় রিক্তহস্ত।”

খায়বরের ইহুদীরা এ খবর পেয়ে তাদের মিত্র বনু গাতফানের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে দূত পাঠায়। তাদের বলা হয়, “মুসলমানদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলে খায়বরের মোট উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক তোমাদের দেওয়া হবে।”

এই লোভনীয় প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়ে বনু গাতফানের লোকেরা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে খায়বর অভিমুখে রওয়ানা হয়। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর তারা পেছন দিক থেকে শোরগোল শুনে ধারণা করে যে, মুসলিম বাহিনী হয়তো তাদের পরিবার ও পশুপালের ওপর হামলা করেছে। ফলে তারা খায়বরের পরিকল্পনা বাতিল করে নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করে। নিঃসন্দেহে এটি ছিল আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য।

যুদ্ধকৌশলের দিক বিবেচনা করে রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিকে সিরিয়ার পথ ধরে খায়বর অভিমুখে অগ্রসর হন, যাতে বনু গাতফানের পক্ষ থেকে ইহুদীদের সাহায্য পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং ইহুদীরাও এই পথে পালিয়ে যেতে না পারে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নীতি ছিল—যুদ্ধের উদ্দেশ্যে কোথাও গেলে আগের দিন রাতে সেখানে পৌঁছে অবস্থান নেওয়া এবং সকালে আক্রমণ করা। খায়বরের ক্ষেত্রেও তিনি তাই করেন। তবে শিবির স্থাপনের বিষয়ে তিনি নিজের পূর্ব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অভিজ্ঞ যুদ্ধবিশারদ আনসার সাহাবি হুবাব ইবনুল মুনযির (রা.)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং শহরের একেবারে নিকটে শিবির স্থাপন করেন, যেখান থেকে দুর্গগুলো স্পষ্ট দেখা যেত।

খায়বর বহু দুর্গবেষ্টিত ও উর্বর কৃষিজমিতে সমৃদ্ধ ছিল। জনবসতি দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল—প্রথম অঞ্চলে পাঁচটি এবং দ্বিতীয় অঞ্চলে তিনটি দুর্গ ছিল।

ক্রমে একে একে খায়বরের বহু দুর্গ এবং সেখানকার ধনসম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কঠোর প্রহরায় সুরক্ষিত কামুস দুর্গ অবরোধ করা হয়, যা মুসলমানরা ১৩তম থেকে ১৯তম দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখেন।

কামুস দুর্গ দখলের জন্য মুসলমানরা একাধিকবার পৃথক পৃথক দলে আক্রমণের চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিবারই তা ব্যর্থ হয়।

এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) কামুস দুর্গ জয়ের জন্য আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর হাতে পতাকা দিয়ে পাঠান। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন, কিন্তু দুর্গ জয় করতে না পেরে ফিরে আসেন। পরদিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে পতাকা দিয়ে পাঠানো হয়। তিনিও প্রবল যুদ্ধ করেন, কিন্তু সফল হতে না পেরে ফিরে আসেন।

সেই রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন,
“আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন। তার হাতেই আল্লাহ বিজয় দান করবেন।”

সকালে সকল সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। প্রত্যেকের মনে আশা ছিল পতাকা তার হাতেই দেওয়া হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন,
“আলী ইবনে আবু তালিব কোথায়?”

সাহাবিরা বললেন,
“তিনি চক্ষুরোগে ভুগছেন।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন,
“তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।”

আলী (রা.)-কে আনা হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ মুখের লালা তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আলী (রা.) সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন—এমনভাবে যেন আগে কখনো তাঁর চোখে কোনো রোগই ছিল না।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাতে পতাকা দিয়ে বললেন,
“এই পতাকা নিয়ে এগিয়ে যাও। আল্লাহ যতক্ষণ না তোমার হাতে বিজয় দান করেন, ততক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।”

আলী (রা.) পতাকা নিয়ে সেনাদলসহ কামুস দুর্গের সামনে উপস্থিত হলেন। তিনি দুর্গের নিকটে একটি পাথরের স্তূপের ওপর পতাকা স্থাপন করলেন। দুর্গের ওপর থেকে এক ইহুদি তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কে?”

তিনি উত্তর দিলেন,
“আমি আবু তালিবের পুত্র আলী।”

ইহুদি বলল,
“তাওরাতের শপথ! তোমরাই বিজয়ী হবে।”

এরপর ইহুদিরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধ চলাকালে এক ইহুদির আঘাতে আলী (রা.)-এর ঢাল পড়ে যায়। তখন আত্মরক্ষার জন্য তিনি দুর্গের দেয়াল থেকে একটি ভারী দরজা তুলে নেন। বলা হয়ে থাকে, দরজাটি এত ভারী ছিল যে পরে সেটিকে পুনরায় স্থানে বসাতে আটজন লোককে একসঙ্গে চেষ্টা করতে হয়েছিল।

এরপর ইহুদিদের অন্যতম নেতা ও অভিজ্ঞ যোদ্ধা মারহাব আলী (রা.)-এর সম্মুখে এগিয়ে আসে। সে গর্বভরে কবিতার ছন্দে বলে ওঠে—

“খায়বার ভালো করেই জানে আমি মারহাব,
অস্ত্রে সজ্জিত, যুদ্ধে পরীক্ষিত।
কখনো বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করি,
কখনো তরবারির আঘাতে শত্রু ঘায়েল করি।
যখন আমার অগ্নিসম ক্রোধ সিংহের মতো জ্বলে ওঠে।”

মারহাব আলী (রা.)-কে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানায়। আলী (রা.) সেই আহ্বান গ্রহণ করে সামনে অগ্রসর হন। উভয়ের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। দ্বিতীয় আঘাতেই আলী (রা.)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের শিরস্ত্রাণ দু’টুকরো হয়ে যায় এবং তার মাথা বিদীর্ণ হয়। এতে মারহাব নিহত হয়।

মারহাব নিহত হওয়ার পর তার ভাই ইয়াস সামনে এগিয়ে আসে, কিন্তু সে যুবায়ের (রা.)-এর হাতে নিহত হয়। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ তুমুল যুদ্ধ চলে। ইহুদিদের বহু নেতা নিহত হলে তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং দ্রুতই দুর্গটি মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) খায়বরবাসীদের অবশিষ্ট দুটি দুর্গ—ওয়াতীহ ও সুলালিম—অবরোধ করেন। যখন তারা নিশ্চিত হয়ে যায় যে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তখন তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রাণভিক্ষা চায় এবং খায়বর থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার প্রস্তাব দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের প্রাণভিক্ষা দেন এবং প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

এর আগেই তিনি আশ-শাক্ক, আন-নাতাহ ও আল-কুতাইবা অঞ্চলের জমিসহ সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ এবং উক্ত দুটি দুর্গ ব্যতীত অন্যান্য সব দুর্গ অধিকার করে নিয়েছিলেন।

খায়বরের ঘটনার সংবাদ ফাদাকবাসীর কাছেও পৌঁছে যায়। তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে প্রাণভিক্ষা দেয় এবং বহিষ্কৃত হওয়ার বিনিময়ে জমিজমা ও ধনসম্পদ হস্তান্তরের প্রস্তাব করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে মুহাইসা ইবনে মাসউদ অন্যতম ছিলেন, যিনি বনু হারিসা গোত্রের লোক ছিলেন।

পরবর্তীতে খায়বরবাসীরা অনুরোধ জানায় যেন তাদের বহিষ্কার না করে অর্ধেক বর্গাভাগের ভিত্তিতে জমি চাষের অনুমতি দেওয়া হয়। তারা যুক্তি দেখায় যে, তারা জমি চাষে অধিক দক্ষ ও অভিজ্ঞ। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ প্রস্তাব মঞ্জুর করেন এবং শর্ত আরোপ করেন যে, মুসলমানরা ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় তাদের উচ্ছেদ করতে পারবে। ফাদাকবাসীরাও একই শর্তে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।

এভাবে খায়বর মুসলমানদের যৌথ সম্পত্তিতে পরিণত হয়।