মুহাম্মদ আল ফাতেহের কনস্টান্টিনোপল বিজয় ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের পতন

আট শতাব্দী যাবৎ কনস্টান্টিনোপল বিজয় ছিল মুসলিম সেনাপতিদের কাছে একটি স্বপ্ন। বিশিষ্ট সাহাবি মুয়াবিয়া ইবনে সুফিয়ান (রা.)-এর যুগ থেকে অনেকেই কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই সফল হতে পারেননি। প্রত্যেক মুসলিম সেনাপতিই আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কারণ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ীর ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রশংসা করে গেছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা (মুসলিমরা) অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল বিজয় করবে। কতই না অপূর্ব হবে সেই বিজয়ী সেনাপতি, কতই না অপূর্ব হবে তার সেনাবাহিনী।” (আহমাদ আল-মুসনাদ ১৪:১৩১)।

যখন পৃথিবীর দিকে দিকে ইসলামের বিজয়গাথা ছড়িয়ে পড়ছিল, সে সময় প্রায় প্রত্যেক শাসকই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণিত সেই সৌভাগ্যবান সেনানায়ক হওয়ার চিন্তা করেছেন। কনস্টান্টিনোপল সম্পর্কে বলা হতো—যদি সারা দুনিয়া শুধু একটি রাষ্ট্র হয়, তাহলে কনস্টান্টিনোপল তার রাজধানী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত।

কনস্টান্টিনোপল এমন কোনো শহর ছিল না, যা চাইলেই জয় করা সম্ভব। সে সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও উপযুক্ত এই শহরটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ছিল সবচেয়ে উন্নত। এজন্যই এর আগে যত আক্রমণ হয়েছে, তার সবকটিই কনস্টান্টিনোপলের বিরাটাকার দেওয়ালের সামনে এসে পরাজিত হয়েছে।

এরকমই একজন শাসক ছিলেন মুহাম্মদ আল-ফাতিহ বা দ্বিতীয় মুহাম্মদ খান। মুহাম্মদ আল-ফাতিহ ১৪৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের মৃত্যুর পর মাত্র ২০ বছর বয়সে অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান হন। এই বয়সেই তিনি কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী।

প্রাকৃতিকভাবেই কনস্টান্টিনোপল পেয়েছিল দারুণ এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। শহরের তিন দিক ছিল সামুদ্রিক জলভাগ দ্বারা বেষ্টিত—বসফরাস প্রণালি, মারমারা সাগর এবং গোল্ডেন হর্ন। তাছাড়া স্থলভাগের অংশটুকু দানবের মতো উঁচু এবং চওড়া দেওয়াল দিয়ে সুরক্ষিত ছিল, যা ভেঙে শহরে প্রবেশ করা ছিল একপ্রকার দুঃসাধ্য।

তাই তাঁর স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ ছিল বসফরাস প্রণালির অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, যাতে ইউরোপ থেকে কনস্টান্টিনোপলে আসা যে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা তিনি প্রতিরোধ করতে পারেন। তাই তিনি ইউরোপীয় সমুদ্র উপকূলে রোমান ও আনাতোলিয়া নামে বিশাল দুর্গ তৈরি করেন। রোমান দুর্গটি নির্মাণে তিন মাস সময় লেগেছিল, যার কারণে কোনো জাহাজের অটোমান বাহিনীর অনুমতি ছাড়া পারাপার করা সম্ভব ছিল না।

কনস্টান্টিনোপল হামলার প্রস্তুতি হিসেবে সুলতান মুহাম্মদ আরবান নামক একজন বিচক্ষণ ইঞ্জিনিয়ারকে বৃহৎ আকৃতির কামান তৈরির নির্দেশ দেন। আরবান বৃহদাকারের বেশ কয়েকটি কামান তৈরি করে, যার মাধ্যমে বিরাট ওজনের গোলা নিক্ষেপ করা যেত।

সুলতান সর্বপ্রথম তাঁর সাম্রাজ্যের প্রতিটি অংশে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর কনস্টান্টিনোপল আক্রমণের উদ্দেশ্যে পঞ্চাশ হাজার অশ্বারোহী এবং বিশ হাজার পদাতিক সৈন্যের একটি দুর্বার বাহিনী গড়ে তোলেন।

৮৫৬ হিজরিতে (১৪৫২ খ্রি.) উভয় পক্ষই প্রকাশ্য যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে। সম্রাট কনস্টান্টিন কনস্টান্টিনোপলের অভ্যন্তরে সীমাতিরিক্ত রসদ-সামগ্রী একত্র করেছিলেন। তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ছোট-বড় জাহাজে করে সৈন্য, রসদ ও অস্ত্রসামগ্রী আসছিল।

বিভিন্ন দেশের স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার এবং অভিজ্ঞ সামরিক অধিনায়করা কনস্টান্টিনোপল শহরকে সবদিক দিয়ে সুদৃঢ় করে তোলার জন্য সেখানে এসে হাজির হয়েছিলেন। গোল্ডেন হর্নে এপাশ থেকে ওপাশে একটি বিরাট লৌহশিকল স্থাপন করা হয়, যাতে কোনো জাহাজ বিনা অনুমতিতে বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে। চৌদ্দ মাইল ব্যাসার্ধের নগর প্রাচীর অত্যন্ত মজবুত ও সুদৃঢ় করে গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রাচীরের চারদিকে গভীর পরিখা খনন করা হয়। প্রাচীর রক্ষা টাওয়ারে কামান ও তীরন্দাজ প্লাটুনসমূহ মোতায়েন করা হয়। পুরাতন টাওয়ার এবং প্রাচীরের দুর্বল স্থান মেরামত করা হয়।

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল (৮৫৭ হিজরির ২৬ রবিউল আউয়াল) সুলতান তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীরের সামনে গিয়ে উপনীত হন। অপরদিকে উসমানীয় জাহাজসমূহ গোল্ডেন হর্নের সম্মুখে সামুদ্রিক অবরোধ গড়ে তোলে। সুলতানী নৌপ্রধান ছিলেন বালুত আগলান নামক জনৈক অধিনায়ক।

সুলতান নগর প্রাচীর অবরোধ করে এখানে-সেখানে খণ্ডবাহিনী মোতায়েন করেন এবং সুলতানের নির্দেশে অগ্রবর্তী বাহিনী নগর প্রাচীরের সন্নিকট পর্যন্ত সুড়ঙ্গ তৈরি করে। তারপর বিভিন্ন স্থানে পরিখা খনন করে সেখানে সুড়ঙ্গপথের মাধ্যমে তীরন্দাজদের মোতায়েন করা হয়, যাতে শত্রুবাহিনীর কেউ নগর প্রাচীরের উপর দিয়ে উঁকি মারলে তাকে হত্যা করা যায়। এই অবরোধ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সুলতান তাঁর বিস্ময়কর যোগ্যতার পরিচয় দেন। উসমানীয়রা যত শীঘ্র সম্ভব অবরোধ বেষ্টনী সংকীর্ণ করে শহর প্রাচীরের সন্নিকটে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। মিনজানিক এবং কামানসমূহ উপযুক্ত স্থানে বসিয়ে নগর প্রাচীরে গোলা ও প্রস্তর বর্ষণ করা হয়। এছাড়াও সুলতান তাঁর সঙ্গে যে বড় কামানগুলো এনেছিলেন, সেগুলো দিয়েও গোলা বর্ষণ করা হচ্ছিল। কিন্তু তাতে সমস্যা ছিল—ঐ কামানগুলো দিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র সাত-আটবার গোলা নিক্ষেপ করা যেত। এর ফলে এই সময়ের মধ্যে খ্রিস্টানরা আবার দেওয়াল মেরামত করে ফেলত।

এদিকে খ্রিস্টানরা নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য সবদিক থেকেই প্রস্তুত ছিল। তাঁদের অধিনায়করা অত্যন্ত যোগ্যতা ও দুঃসাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব কায়সার কনস্টান্টিন নিজ হাতে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি স্বয়ং প্রত্যেকটি সৈন্যকে উৎসাহ জোগাতেন। ধর্মগুরুরা ধর্মের বরাত দিয়ে মানুষকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিতে উৎসাহিত করত।

প্রথম প্রথম খ্রিস্টানরা নগর প্রাচীর থেকে বের হয়ে মুসলিমদের উপর হামলা চালাত। ফলে খ্রিস্টানরা উসমানীয়দের হাতে বেশি নিহত হতে থাকে। এতে কনস্টান্টিন কোনো ব্যক্তিকে নগর প্রাচীরের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। এবার খ্রিস্টানরা নগর প্রাচীর ও টাওয়ারসমূহ থেকে কামান ও মিনজানিকের সাহায্যে উসমানীয়দের হামলার প্রত্যুত্তর দিতে থাকে।

এদিকে উসমানীয়রা পরিখার বেশ কয়েকটি জায়গা ভরাট করে পায়ে চলার পথ তৈরি করে। উসমানীয়রা প্রাচীর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু তারা প্রাচীরের উপর আরোহণ করতে গেলে খ্রিস্টানরা উপর থেকে গরম তেল উসমানীয়দের উপর নিক্ষেপ করত। অতএব বাধ্য হয়ে তাদের সেখান থেকে ফিরে আসতে হয়।

এবার সুলতান আরেকটি নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি প্রাচীরের সমান উঁচু কাঠের অনেকগুলো মিনার তৈরি করে সেগুলোতে চাকা লাগান। তারপর ঠেলতে ঠেলতে মিনারগুলোকে প্রাচীরের কাছে নিয়ে দাঁড় করান। মিনারগুলোর সঙ্গে একটি করে দীর্ঘ সিঁড়ি লাগানো হয়েছিল। এবার উসমানীয় সৈন্যরা ঐ মিনারের উপর উঠে সিঁড়ি বেয়ে নগর প্রাচীরের উপর পৌঁছানোর চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু অবরুদ্ধরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঐ সমস্ত মিনারের উপর জ্বলন্ত রজনের গোলা নিক্ষেপ করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। ফলে মিনার ও সিঁড়িসমূহ পুড়ে যাওয়ায় দুর্গ ধ্বংসের এই কৌশলও ব্যর্থ হয়।

১৫ এপ্রিল, অর্থাৎ অবরোধের নবম দিনে, সুলতান খবর পান যে জেনোভার চারটি জাহাজ উসমানীয় জাহাজের ব্যূহ ভেদ করে খাদ্য ও সমরাস্ত্র নিয়ে গোল্ডেন হর্ন অতিক্রম করে শহরবাসীদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই সংবাদ পাওয়া মাত্র সুলতান স্বয়ং ঘোড়ায় চড়ে সমুদ্রতীরে এসে দেখেন—আরও পাঁচটি শত্রু জাহাজ আসছে। সুলতান সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নৌপ্রধানকে এই জাহাজগুলোকে বাধা দিতে নির্দেশ দেন।

এদিকে সুলতান সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে ঐ জাহাজগুলোর গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। অপরদিকে খ্রিস্টানরাও নগর প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। উসমানীয় জাহাজগুলো অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে হামলা চালিয়ে ঐ জাহাজগুলোর দীর্ঘ লাইন ভেঙে দেয়। কিন্তু ঐ জাহাজগুলো এত প্রকাণ্ড ছিল যে উসমানীয় সৈন্যরা নিজেদের ক্ষুদ্র ও নিচু জাহাজ থেকে সেগুলোতে চড়তে ব্যর্থ হয়। আর শত্রু জাহাজগুলো অনায়াসেই গোল্ডেন হর্নে ঢুকে পড়ে।

সুলতান নিজ চোখে দেখে তাঁর নৌবাহিনীর এই অবস্থা দেখে দুঃখিত হন। তিনি তাঁর নৌপ্রধানকে ডেকে কঠোরভাবে শাসন করেন এবং আরও বেশি তৎপর থাকার নির্দেশ দেন। যদিও এ ক্ষেত্রে নৌপ্রধানের কোনো ত্রুটি ছিল না। কিন্তু সুলতানের সতর্কবার্তার ফলে নৌপ্রধান অত্যধিক তৎপর থাকেন। ফলে এরপর আর কোনো শত্রু জাহাজ দার্দানেলিস সমুদ্রপথ অতিক্রম করে মারমারা সাগরে প্রবেশ করার দুঃসাহস দেখায়নি।

সুলতান অবরোধের ক্ষেত্রে কল্পনাতীত তৎপরতা প্রদর্শন করেন। বারবার তিনি ক্ষতির সম্মুখীন হন, বারবার তাঁর আক্রমণ ব্যর্থ হয়। আর খ্রিস্টানরা নিজেদের সাফল্য প্রত্যক্ষ করে আরও বেশি সাহসী হয়ে ওঠে। শহরের অভ্যন্তরে প্রতিরোধ সামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্যের কোনো ঘাটতি ছিল না। তারা বছরের পর বছর অবরুদ্ধ থেকেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দৃঢ় সংকল্প নিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল—হাঙ্গেরির সম্রাট হুনিয়াদি নিজ সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে অবশ্যই উত্তর দিক থেকে সুলতানি বাহিনীর উপর হামলা চালাবেন। ফলে কনস্টান্টিনোপলের অবরোধ আপনা-আপনি উঠে যাবে।

সুলতানের স্থলে যদি অন্য কোনো ব্যক্তি থাকতেন, তাহলে এই সব অবস্থা লক্ষ্য করার পর নিশ্চয়ই তিনি অবরোধ তুলে স্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করতেন। কিন্তু সুলতান ছিলেন তাঁর সংকল্পে অটল এবং সাহসে সুদৃঢ়। এতসব ঘটনার পরও তাঁর মনে কোনো রকম দুর্বলতা স্থান পায়নি। বরং প্রত্যেকটি ব্যর্থতাই তাঁর সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল।

এদিকে অবরোধ চলাকালে সুলতানের মনে এমন একটি বুদ্ধি আসে, যার কথা ইতিপূর্বে কেউ চিন্তাও করতে পারেনি। গোল্ডেন হর্ন দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে না পারায় ঐ দিকটি অবরোধের আওতায় আসছিল না। ফলে উসমানীয়রা স্থলভাগের দিকেই তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছিল। সুলতান ভাবলেন, “যদি গোল্ডেন হর্নের দিক থেকে, অর্থাৎ সমুদ্রের দিক থেকে শহরের উপর হামলা চালানো যায়, তাহলে শত্রুপক্ষের মনোযোগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং তখনই নগর প্রাচীর ধ্বংস করে অভ্যন্তরে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।”

কিন্তু গোল্ডেন হর্নের মোহনায় স্থাপিত লৌহশিকল হামলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গোল্ডেন হর্নের পূর্বদিকে আনুমানিক দশ মাইল চওড়া একটি স্থলভূমি ছিল, যার অপরদিকে ছিল বসফরাস প্রণালীর সমুদ্রভাগ। সুলতান জমাদিউল আউয়ালের ১৪ তারিখ রাতে, যখন চন্দ্রকিরণে আকাশ ঝলমল করছিল, ঠিক তখনই বসফরাস থেকে শুরু করে গোল্ডেন হর্ন সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত সর্বত্র কাঠের তক্তা বিছিয়ে দেন।

তারপর আশিটি জাহাজকে তীরে টেনে তোলা হয়। এরপর হাজার হাজার মানুষ সেগুলো ধাক্কাতে শুরু করে। ঐ সময় ঐ দিককার বায়ুও অনুকূলে থাকায় জাহাজগুলোতে পাল তুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুব একটা ধাক্কা না লাগালেও জাহাজগুলো পিচ্ছিল কাঠের তক্তার উপর দিয়ে আপনাআপনি চলতে থাকে।

ঐ রাতে শহরবাসীরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ছিল। কিন্তু উসমানীয় বাহিনী কী করছে, তা তারা বুঝতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত ভোর হওয়ার আগেই মুসলিম বাহিনী ঐ জাহাজগুলো ঠেলে ঠেলে গোল্ডেন হর্ন বন্দরে নিয়ে গিয়ে নামায়। ভোর হতেই শহরবাসীরা দেখতে পায়, উসমানীয় জাহাজসমূহ নগরীর নিচে এসে কামানসমূহ যথাযথ স্থানে বসিয়ে নগর প্রাচীরের দুর্বল অংশের উপর গোলাবর্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই দৃশ্য দেখে খ্রিস্টানরা হতভম্ব হয়ে পড়ে। তারা তাদের জাহাজগুলো গোল্ডেন হর্নের মোহনার দিক থেকে অভ্যন্তরে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু উসমানীয়রা পূর্ব থেকেই উভয় তীরে বসিয়ে রাখা কামান দিয়ে খ্রিস্টান জাহাজগুলোর উপর অনবরত গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং সেগুলো ডুবিয়ে দেয়।

এভাবে হঠাৎ সমুদ্রের দিক থেকে হামলা পরিচালিত হওয়ায় খ্রিস্টানদের প্রতিরোধ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে শহরের অভ্যন্তরভাগেও তাদের একটি বিরাট বাহিনী মোতায়েন করতে হয়।

ঐ দিনই, অর্থাৎ ২৪ মে, সম্রাট কনস্টান্টিন সুলতানের কাছে একটি পয়গাম পাঠান। তাতে বলা হয়, “আপনি আমার উপর যে পরিমাণ কর নির্ধারণ করবেন, আমি তা পরিশোধ করতে রাজি আছি। আপনি আমাকে করদাতা করে কনস্টান্টিনোপলের শাসনক্ষমতা আমার হাতেই থাকতে দিন।”

শহর যখন পদানত হওয়ার উপক্রম হয়েছে, ঠিক তখনই সুলতান উক্ত পয়গামের যে জবাব পাঠান তা হলো—“যদি তুমি আমার আনুগত্য স্বীকার কর, তাহলে তোমাকে গ্রিসের দক্ষিণাংশ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কনস্টান্টিনোপলকে আমি আমার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত না করে ছাড়ব না।”

সুলতান ভালোভাবেই জানতেন, কনস্টান্টিনোপলে এই খ্রিস্টান সাম্রাজ্য যতদিন ইসলামী সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে টিকে থাকবে, ততদিন অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তিনি এও জানতেন, কনস্টান্টিনোপল উসমানীয় সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম রাজধানী হতে পারে।

তিনি কনস্টান্টিন এবং তাঁর পূর্ববর্তী কায়সারদের দুষ্কর্ম সম্পর্কেও ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। তাছাড়া দীর্ঘদিনের অবরোধ ও অনেক কষ্ট সহ্য করার পর তিনি সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছিলেন। এমন সময় কনস্টান্টিনের আবেদনে তাকে গ্রিসের দক্ষিণাংশ প্রদান করতে রাজি হওয়াও ছিল একটি উদারতা। কিন্তু কনস্টান্টিনের ভাগ্যে লেখা ছিল—তিনি হবেন পূর্বরোমের এই সুপ্রাচীন ও বিরাট খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের শেষ অধিপতি।

তাই তিনি সুলতানের এই বদান্যতা গ্রহণ না করে পূর্বের চেয়ে আরও চতুর্গুণ শক্তি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

৮৫৭ হিজরির ১৯ জমাদিউল আউয়াল (১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মে) সুলতান তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘোষণা দেন—“আগামীকাল ভোরবেলা চারদিক থেকে শহরের উপর আক্রমণ চালানো হবে।” তখন সৈন্যদের শহরের অভ্যন্তরে লুটপাটের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে কোনো সরকারি ইমারতের ক্ষতি করা যাবে না। যারা আনুগত্য স্বীকার করবে, তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা করা যাবে না।

এই ঘোষণা শুনে মুসলিম সেনাদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে কনস্টান্টিন শহরের প্রাসাদে জরুরি সভা ডেকে আসন্ন চূড়ান্ত আক্রমণের কথা জানিয়ে শহরবাসীকে আমৃত্যু প্রতিরোধের আহ্বান জানান। শপথ শেষে অধিনায়কেরা নিজ নিজ দায়িত্বে চলে গেলে তিনি অল্প বিশ্রাম নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে সেন্ট রোমানুস গেটের দিকে রওনা হন, যেখানে উসমানীয়দের প্রধান আক্রমণ চলছিল।

এদিকে সুলতান ফজরের সালাত আদায় করে তাঁর বিশেষ অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে নিজেও সরাসরি হামলায় অংশ নেন। চারদিক থেকে আক্রমণ শুরু হয়। কামান ও মিনজানিকের আঘাতে নগর প্রাচীরে গর্ত সৃষ্টি হলে উসমানীয়রা সেসব গর্ত দিয়ে শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রতিবারই খ্রিস্টানরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

কয়েকবার উসমানীয় বাহিনীর বীর সৈন্যরা টাওয়ার ও প্রাচীরের ভগ্নাংশে আরোহণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ভেতর দিক থেকে খ্রিস্টান সৈন্য, সাধারণ অধিবাসী এমনকি নারী ও শিশুরাও সর্বশক্তি দিয়ে তাদের বাধা দিতে থাকে।

স্থল ও জল—সব দিকেই উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনার সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে। চারদিকে শুধু সংঘর্ষ আর সংঘর্ষ। যেদিকেই চোখ যায়, সেদিকেই লাশের স্তূপ। তবুও কোনো পক্ষই হার মানতে প্রস্তুত ছিল না। দুপুরের দিকে সংঘর্ষ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

খ্রিস্টানদের সাহস ও অসাধারণ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করে উসমানীয়রা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষিতে সুলতান আশঙ্কা করছিলেন—আজ ও এখনই যদি সম্ভব না হয়, তাহলে এই শহর দখল করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কেননা হামলাকারীরা তাদের পরিপূর্ণ সাহস ও শক্তি ইতোমধ্যেই প্রয়োগ করে ফেলেছে।

এদিকে কামান ও মিনজানিকের আঘাতে সুলতানের সম্মুখবর্তী নগর প্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে পড়লে সেখান দিয়ে সুলতানি সৈন্যদের জন্য অভ্যন্তরে প্রবেশ করা অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে। অপরদিকে সুলতানের নৌবাহিনী সেদিককার একটি টাওয়ার দখল করে সেখানে সুলতানি পতাকা উত্তোলন করে।

রিজার্ভ বাহিনী যখন দেখতে পায় টাওয়ারের উপর সুলতানি পতাকা উড়ছে এবং সম্মুখভাগের নগর প্রাচীরও ভেঙে পড়েছে, তখন তারাও নিজেদের অবস্থান ছেড়ে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। খ্রিস্টানরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সুলতানি বাহিনীর মোকাবিলা করে। কিন্তু মুখোমুখি যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত তারা মুসলমানদের সামনে টিকে থাকতে পারেনি।

এবার উসমানীয়রা চারদিক থেকে শহরে প্রবেশের সংকল্প নেয় এবং প্রাচীরের দরজাসমূহ ভেঙে চুরমার করে সাফল্য অর্জন করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই নগর প্রাচীরের অভ্যন্তরে খ্রিস্টানদের লাশের স্তূপ জমে ওঠে।

সুলতান ঘোড়ায় চড়ে প্রাচীরের ঐ ভগ্ন অংশ দিয়েই সোজা সেন্ট আয়া সুফিয়া গির্জায় যান। গির্জায় পৌঁছেই তিনি আজান দেন। সেখানেই প্রথমবারের মতো ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়। সুলতান ও তাঁর সঙ্গীরা সেখানে জোহরের সালাত আদায় করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।

এরপর সুলতান কনস্টান্টিনের সন্ধানে লোক পাঠান। সেন্ট রোমানুসের নিকটে, যেখানে সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত হয়েছিল, সেখানেই কনস্টান্টিনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে সুলতানের সামনে আনা হয়। এভাবেই কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

এটি ছিল হিজরি ৮৫৭ সনের ২০ জমাদিউল আউয়াল, মোতাবেক ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মে। ঐ দিন থেকেই সুলতান মুহাম্মদ খান ‘সুলতান-ই-ফাতিহ’ (বিজয়ী সুলতান) উপাধিতে ভূষিত হন। মুসলমানদের হাতে চল্লিশ হাজার খ্রিস্টান নিহত হয় এবং ষাট হাজার বন্দি হয়। অতি সামান্য সংখ্যক খ্রিস্টান যোদ্ধাই সেদিন স্থল বা জলপথে প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিল।

বিজয়ী সুলতান কনস্টান্টিনোপলের অধিবাসীদের নিরাপত্তা প্রদান করেন। যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তির দখল বজায় রেখে সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করে, তাদের ঘরবাড়ি কিংবা সহায়-সম্পত্তির কোনো ক্ষতি করা হয়নি। খ্রিস্টানদের উপাসনালয় ও গির্জাসমূহকে (আয়া সুফিয়া ব্যতীত) পূর্বাবস্থায়ই বহাল রাখা হয়।

এই মুহাম্মদ আল ফাতেহের কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের মধ্যমে সমাপ্তি ঘটে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের। যারা ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ১,১২৩ বছর এই কনস্টান্টিনোপল শাসন করে।