রোজা রেখে হাতেগোনা সৈন্য নিয়ে মুসলিমদের যুদ্ধ জয়

হে আল্লাহ! আজ যদি এই দলটি পরাজিত হয়, তবে পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করার আর কেউ থাকবে না। আকাশের দিকে দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)।

রমজান মাস। মরুপ্রান্তরের তপ্ত বাতাস বয়ে যাচ্ছে। চারদিকে নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতর লুকিয়ে আছে এক ইতিহাস। সময়টা দ্বিতীয় হিজরির ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই রমজান। বদরের প্রান্তর। এই প্রান্তরেই সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বড় যুদ্ধ—ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ।

এই যুদ্ধকে পবিত্র কোরআনে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে ইসলাম গ্রহণের কারণে মক্কায় কুরাইশ নেতাদের রোষানলে পড়েন সাহাবিরা। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। মদিনায় গড়ে ওঠে নতুন মুসলিম সমাজ।

এদিকে মক্কার কুরাইশ নেতারা ভাবতে থাকে—এই নতুন শক্তি হিসেবে মদিনার মুসলিম সমাজ কুরাইশদের বাণিজ্যপথ ও প্রভাবের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। আরও কিছু কারণকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় হিজরির ১৭ই রমজান বদরের প্রান্তরে মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশরা প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়।

মদিনা থেকে ছোট্ট একটি দল বের হয়েছিল। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)। তাঁদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। তাঁদের না ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্র, না ছিল যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি। তাঁদের হাতে ছিল মাত্র কয়েকটি তরবারি, আর দলে ছিল মাত্র ৭০টি উট—যেগুলোতে সবাই ভাগাভাগি করে চড়ছিল।

অথচ তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মক্কার শক্তিশালী কুরাইশ বাহিনী, যারা সংখ্যায় ছিল প্রায় ১,০০০ জন, সুসজ্জিত সেনাবাহিনী এবং আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। রমজান মাস হওয়ায় সাহাবিরা তখন রোজা অবস্থায় তপ্ত বালুর ওপর দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার্ত বুকে প্রস্তুত হচ্ছিলেন এক অসম লড়াইয়ের জন্য।

কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে ছিল অবিচল ঈমান। তাঁরা জানতেন—বিজয় সংখ্যায় নয়, বিজয় আসে আল্লাহর সাহায্যে। যুদ্ধ শুরু হলো ধুলিঝড়ের মাঝে তরবারির ঝলকানিতে। সেদিন সেই ৩১৩ জনের ছোট্ট দলটি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। কুরাইশদের বহু প্রভাবশালী নেতা নিহত হয়, আর মুসলমানরা অর্জন করে এক অবিস্মরণীয় বিজয়।

এই বিজয় শুধু একটি যুদ্ধজয় ছিল না; এটি ছিল বিশ্বাসের জয়, ধৈর্যের জয়, আত্মত্যাগের জয়। বদরের প্রান্তর যেন ঘোষণা করেছিল—যারা সত্যের পথে অটল থাকে, আল্লাহ তাদের একা রাখেন না।