মুতার যুদ্ধের প্রায় পাঁচ মাস আগে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। মুতার যুদ্ধের দিন তিনি একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন। তখনও কেউ জানত না—যে যুদ্ধে তিনি একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধ থেকেই তিনি ইতিহাসের একজন সফল মুসলিম সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
যুদ্ধে যখন মুহাম্মদ (সা.)-এর নির্ধারিত তিনজন সেনাপতি—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় পালকপুত্র জায়েদ বিন হারিসা (রা.), তাঁর চাচাতো ভাই জাফর বিন আবু তালিব (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)—তিনজনই শহিদ হন। তিন সেনাপতির শাহাদাতের কারণে মুসলিম বাহিনী নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনী তখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায়। তখন ছাবেত ইবনে আরকাম (রা.) নামক একজন বিশিষ্ট সাহাবি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, “হে মুসলমানরা, তোমরা উপযুক্ত একজনকে সেনাপতির দায়িত্ব দাও।”
সাহাবিরা ছাবেত (রা.)-কেই সেনাপতির দায়িত্ব নিতে বললে তিনি বলেন, “আমি এ কাজের উপযুক্ত নই।”
এরপর ছাবেত ইবনে আরকাম (রা.) খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর দিকে পতাকা এগিয়ে দেন। খালিদ (রা.) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পুরো বাহিনীকে ঢেলে সাজান। পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায় মুসলিম বাহিনী। তারা মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে একযোগে প্রবল হামলা চালায় দুই লাখ সুসজ্জিত রোমান সেনার ওপর। ঘুরে যায় যুদ্ধের মোড়। যুদ্ধে তিনজন সেনাপতিসহ ১২ জন মুসলিম শহিদ হন। অন্যদিকে রোমানদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল মুসলিমদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাঁদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আন্দাজ করা যায় খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর একটি বর্ণনা থেকে। তিনি বলেন, “মুতার যুদ্ধের দিনে আমার হাতে নয়টি তলোয়ার ভেঙেছে। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনি ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিল।”
এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) রণক্ষেত্রের খবর লোক মারফত পৌঁছার আগেই ওহির মাধ্যমে জানতে পারেন। মুসলমানদের মাত্র তিন হাজার সৈন্যের দুই লাখ রোমান সৈন্যের সামনে টিকে থাকা ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা।
মুসলিমদের তীব্র আক্রমণে হতচকিত রোমান সৈন্যরা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায় এবং নিজেদের তাবুতে ফিরে যায়। মুসলিমরা উপলব্ধি করে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে বিজয় লাভ করা সম্ভব নয়। তাই মুসলিমরা যুদ্ধ অমীমাংসিত রেখে মদিনায় ফিরে যায়। তারা জানতেন না, তাদের এই প্রত্যাবর্তনকে রাসূলুল্লাহ (সা.) কীভাবে নেবেন।
খালিদের বাহিনী যখন মদিনার পথে, তখন মদিনার মানুষ তাদের তিরস্কার করতে থাকে। তারা ধিক্কার দিয়ে বলে, “তোমরা আল্লাহর পথ থেকে পালিয়ে এসেছ।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) বিচলিত না হয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর কাঁধে হাত রেখে বলেন, “হে সুলাইমানের পিতা, আজ তুমি যে বীরত্ব দেখিয়েছ, তার অধিক আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বীরত্ব ও কৌশলের প্রশংসা করে তাঁকে ‘সাইফুল্লাহ’ তথা ‘আল্লাহর তলোয়ার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
