খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল (৬৩২ -৬৬১) (শেষ পর্ব)

**এখানে খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল চারটি পর্বে তুলে ধরা হবে। পুরো লেখাটা ভালো ভাবে বুঝতে গত তিনটি পর্ব দেখার অনুরোধ রইল**

হযরত আলী (রা)

হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর বিদ্রোহীরা হযরত তালহা, যুবাইর ও আলী (রা)-কে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ দেয়। প্রত্যেকেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানান। অবশেষে মানুষের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। এজন্য সর্বশ্রেণীর মুসলমানের সম্মতি প্রয়োজন । মসজিদে নববীতে সাধারণ সভা হলো। মাত্র ষোল অথবা সতেরো জন সাহাবা ছাড়া সকল মুহাজির ও আনসার আলীর (রা) হাতে বাইয়াত করেন। অত্যন্ত জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে হযরত আলীর (রা) খিলাফতের সূচনা হয় । খলীফা হওয়ার পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল হযরত উসমান (রা)-এর হত্যাকারীদের শাস্তি বিধান করা । কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। প্রথমতঃ হত্যাকারীদের কেউ চিনতে পারেনি । হযরত উসমানের স্ত্রী হযরত নায়িলা হত্যাকারীদের দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের কাউকে চিনতে পারেননি। দ্বিতীয়তঃ মদীনা তখন হাজার হাজার বিদ্রোহীদের কব্জায় ৷ তারা হযরত আলীর (রা) সেনাবাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু তাঁর এই অসহায় অবস্থা তৎকালীন অনেক মুসলমানই উপলব্ধি করেননি। তাঁরা হযরত আলী (রা)-এর নিকট তক্ষুণি হযরত উসমান (রা)-এর হত্যা দাবী করেন। এই দাবী উত্থাপনকারীদের মধ্যে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা) সহ তালহা ও যুবাইর (রা)-এর মত বিশিষ্ট সাহাবীরাও ছিলেন। তাঁরা হযরত আয়িশার (রা) নেতৃত্বে সেনাবাহিনী সহ মক্কা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করেন। আলীও (রা) তাঁর বাহিনীসহ সেখানে পৌছেন। বসরায় বিরোধী দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। হযরত আয়িশা (রা) আলী (রা)-এর কাছে তাঁর দাবী পেশ করেন। আলী (রা)-ও তাঁর সমস্যাসমূহ তুলে ধরেন। যেহেতু উভয় পক্ষেই ছিল সততা ও নিষ্ঠা তাই নিষ্পত্তি হয়ে যায়। হযরত তালহা ও যুবাইর ফিরে চললেন। আয়িশাও ফেরার প্রস্তুতি শুরু করলেন। কিন্তু মুনাফিকরা উভয় বাহিনীতেই ছিল। তাই আপোষ মীমাংসায় তারা ভীত হয়ে পড়ে। তারা সুপরিকল্পিতভাবে রাতের অন্ধকারে এক পক্ষ অন্য পক্ষের শিবিরে হামলা চালিয়ে দেয়। ফল এই দাঁড়ায়, উভয় পক্ষের মনে এই ধারণা জন্মালো যে, আপোষ মীমাংসার নামে ধোঁকা দিয়ে প্রতিপক্ষ তাঁদের ওপর হামলা করে বসেছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আলী (রা)-এর জয় হয়। তিনি বিষয়টি হযরত আয়িশাকে (রা) বুঝাতে সক্ষম হন। আয়িশা (রা) বসরা থেকে মদীনায় ফিরে যান।

যুদ্ধের সময় আয়িশা উটের ওপর সওয়ার ছিলেন। ইতিহাসে তাই এ যুদ্ধ ‘উটের যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। হিজরী ৩৬ সনের জামাদিউস সানী মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আশারায়ে মুবাশশারার সদস্য হযরত তালহা ও যুবাইর (রা.)-সহ উভয় পক্ষে প্রায় তের হাজার মুসলমান শহীদ হন। হযরত আলী (রা) পনের দিন বসরায় অবস্থানের পর কুফায় চলে যান। রাজধানী মদীনা থেকে কুফায় স্থানান্তরিত হয়।

এই উটের যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের প্রথম আত্মঘাতী সংঘর্ষ। অনেক সাহাবী এ যুদ্ধে কোন পক্ষেই যোগদান করেননি। এই আত্মঘাতী সংঘর্ষের জন্য তাঁরা ব্যথিতও হয়েছিলেন। আলীর (রা) বাহিনী যখন মদীনা থেকে রওয়ানা হয়, মদীনাবাসীরা তখন কান্নায় ভেংগে পড়েছিলেন।

হযরত আয়িশার (রা) সাথে তো একটা আপোষরফায় আসা গেল। কিন্তু সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়ার (রা) সাথে কোন মীমাংসায় পৌছা গেল না। হযরত আলী (রা) তাঁকে সিরিয়ার গভর্ণর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। কিন্তু আলীর (রা) নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলেন। তাঁর বক্তব্যের মূলকথা ছিল, ‘উসমান (রা) হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তিনি আলী (রা)-কে খলীফা বলে মানবেন না।
হিজরী ৩৭ সনের সফর মাসে ‘সিফফীন’ নামক স্থানে হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা)-এর বাহিনীর মধ্যে সংগঠিত হয় সিফফীনের যুদ্ধ। এ সংঘর্ষ ছিল উটের যুদ্ধ থেকেও ভয়াবহ।

উভয় পক্ষে প্রায় ৯০ হাজার মুসলমান শহিদ হন। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ‘আম্মার বিন ইয়াসীর, খুযাইমা ইবন সাবিত, ও আবু আম্মারা আল-মাযিনীও ছিলেন। তাঁরা সকলেই আলীর (রা) পক্ষে মুয়াবিয়ার (রা) বাহিনীর হাতে শহীদ হন। এত কিছুর পরেও বিষয়টির ফায়সালা হলো না।সিফীনের সর্বশেষ সংঘর্ষে, যাকে ‘লাইলাতুল হার’ বলা হয়, হযরত আলীর (রা) জয় হতে চলেছিল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) পরাজয়ের ভাব বুঝতে পেরে পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে মীমাংসার আহ্বান জানালেন। তাঁর সৈন্যরা বর্শার মাথায় কুরআন ঝুলিয়ে উঁচু করে ধরে বলতে থাকে, এই কুরআন আমাদের এ দ্বন্দ্বের ফায়সালা করবে । যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলো। হযরত আলীর (রা) পক্ষে আবু মুসা আশয়ারী (রা) এবং হযরত মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষে হযরত ‘আমর ইবনুল ‘আস হাকাম বা সালিশ নিযুক্ত হলেন। সিদ্ধান্ত হলো, এই দুইজনের সম্মিলিত ফায়সালা বিরোধী দু’পক্ষই মেনে নেবেন। দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে মুসলমানদের বড় আকারের এক সম্মেলন হয়। কিন্তু সব ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে যে সিদ্ধান্তটি পাওয়া যায় তা হলো, হযরত আমর ইবনুল আস (রা) হযরত আবু মুসা আশয়ারীর (রা) সাথে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন, শেষ মুহূর্তে তা থেকে সরে আসায় এ সালিশী বোর্ড শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হয় । দুমাতুল জান্দাল থেকে হতাশ হয়ে মুসলমানরা ফিরে গেল। অতঃপর আলী (রা) ও মুয়াবিয়া (রা) অনর্থক রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে সন্ধি করলেন। এ দিন থেকে মূলতঃ মুসলিম খিলাফত দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়।

আলি (রা.)-এর অধীনে ছিল হিজাজ (মক্কা-মদিনা এলাকা), ইরাক, পারস্যের কিছু অংশ ও মিসরের কিছু অংশ। আর মুয়াবিয়া (রা.)-এর অধীনে ছিল সিরিয়া ও মিসর।

এ সময় খারেজী নামে নতুন একটি দলের জন্ম হয়। এই খারেজী সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি আবদুর রহমান মুলজিম, আল-বারাকা ইবন আবদিল্লাহ ও আমর ইবন বকর আত-তামীমী, একদিন এক গোপনবৈঠকে মিলিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মুসলিম উম্মার অন্তর্কলহের জন্য মূলত দায়ী আলী, মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা)। সুতরাং এ তিন ব্যক্তিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত মুতাবিক দায়িত্ব নিল আলীর (রা) এবং আল-বারাক ও ‘আমর দায়িত্ব নিল যথাক্রমে মুয়াবিয়া ও ‘আমর ইবনুল আসের (রা)। হিজরী ৪০ সনের ১৭ রমজান ফজরের নামাযের সময়টি এ কাজের জন্য নির্ধারিত হয়। অতঃপর ইবন মুলজিম কুফা, আল-বারাক দিমাশক ও আমর মিসরে চলে যায়। হিজরী ৪০ সনের ১৬ রমজান শুক্রবার দিবাগত রাতে আততায়ীরা আপন আপন স্থানে ওৎ পেতে থাকে। ফজরের নামাজের সময় হযরত মুয়াবিয়া যখন মসজিদে যাচ্ছিলেন, তাঁরও ওপর হামলা হয়। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। তিনি সামান্য আহত হন। অন্য দিকে আমর ইবনুল আস অসুস্থতার কারণে সেদিন মসজিদে যাননি। তার পরিবর্তে খারেজ ইবন হুজাফা নামে জৈনিক ব্যক্তি ইমামতির দায়িত্ব পালনের জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন। তাঁকেই আমর ইবনুল আস মনে করে হত্যা করা হয়। এভাবে মুয়াবিয়া ও ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) প্রাণে রক্ষা পান।



কিন্তু ফজরের সময় যখন হযরত আলী (রা) নামাযের জন্য মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন পাপাত্মা ইবন মুলজিম শাণিত তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে আহত করে। আহত অবস্থায় আততায়ীকে ধরার নির্দেশ দিলেন।

আততায়ী ইবন মুলজিমকে ধরে আনা হলে আলী (রা) নির্দেশ দেন: “আমি বেঁচে গেলে আমি যা সঙ্গত মনে করব তা করব আর আমি যদি মারা যাই, তোমরা তাকে ঠিক ততটুকু আঘাত করবে যতটুকু সে আমাকে করেছে। তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। যারা বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না”।

অবশেষে ১৭ রমজান ৪০ হিজরী শনিবার কুফায় শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। কুফা জামে’ মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। তবে অন্য একটি বর্ণনা মতে নাজফে আশরাফে তাঁকে সমাহিত করা হয়। হযরত আলী (রা) পাঁচ বছর খিলাফত পরিচালনা করেন। একমাত্র সিরিয়া ও মিসর ছাড়া মক্কা ও মদীনাসহ সব এলাকা তাঁর অধীনে ছিল। তাঁর সময়টি যেহেতু গৃহযুদ্ধে অতিবাহিত হয়েছে, এ কারণে নতুন কোন অঞ্চল বিজিত হয়নি।

“সমাপ্ত”

গত তিনটি পর্ব…..

১,খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল (৬৩২ -৬৬১) (পর্ব-১)

২,খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল (৬৩২ -৬৬১) (পর্ব-২)

৩.খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার শাসন আমল (৬৩২ -৬৬১) (পর্ব-৩)