ইসলামি স্বর্ণযুগের ১০ মহান বিজ্ঞানী (পর্ব-১)

ইসলামের ইতিহাসে অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালকে ইসলামের স্বর্ণযুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সময়ে মুসলিম বিশ্ব ব্যাপক বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সাধন করেছিল। আর তখন জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা শাখায় অবদান রাখতে শুরু করেন  স্বর্ণযুগের  বিজ্ঞানিরা। তাদের মধ্যে ১জনকেই এখানে তুলে ধরা হবে।

১.আব্বাস ইবনে ফিরনাস

যদি মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম আকাশে উড়ার প্রচেষ্টার কথা বলা হয়, তাহলে সবার আগে যাঁর নাম আসে তিনি হলেন মুসলিম বিজ্ঞানী আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তিনি উড়ার জন্য গ্লাইডারের মতো একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যেখানে পালক ও সিল্ক ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইবনে ফিরনাসের বয়স যখন প্রায় ৬৫ বছর, তখন তিনি স্পেনের কর্ডোবা শহরের কাছে জাবাল আল-আরুস পাহাড়ের চূড়া থেকে সেই যন্ত্র নিয়ে উড্ডয়ন করেন। তিনি প্রায় কয়েক মিনিট আকাশে ভেসে থাকতে সক্ষম হন। তবে অবতরণের সময় তাঁর যন্ত্রে লেজের অভাব থাকায় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান এবং গুরুতরভাবে আহত হন।

এরপর তিনি প্রায় ১২ বছর জীবিত ছিলেন এবং এই সময়ের মধ্যেই উড়ান সংক্রান্ত গবেষণা চালিয়ে যান। পাখির উড়ান ও অবতরণ নিয়ে গভীর গবেষণা করে তিনি বুঝতে পারেন যে নিরাপদ অবতরণের জন্য ডানা ও লেজের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।

দীর্ঘ গবেষণার পর ইবনে ফিরনাস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে উড়ন্ত যানের নকশায় ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই গবেষণাই পরবর্তীকালে বিমান আবিষ্কারের পথ প্রশস্ত করে। আধুনিক এভিয়েশন প্রযুক্তির বিকাশে তাঁর ধারণাগুলোর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

ইবনে ফিরনাস ৮১০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম আন্দালুসীয় বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক ও রসায়নবিদ—যাঁকে আজও অনেক মানুষ যথাযথভাবে চেনে না। ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের বহু আগেই তিনি নানা গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন।

তিনি একটি সৌর মডেল তৈরি করেছিলেন, ‘আল-মাকাতা’ নামক একটি জলঘড়ি উদ্ভাবন করেন এবং রক ক্রিস্টাল (পাথরের স্ফটিক) কাটার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন।

এই মহান বিজ্ঞানী ৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

২. ইবনে সিনা

ইবনে সিনা, যাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। ইবনে সিনার জন্ম ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বুখারার (বর্তমান উজবেকিস্তান) অন্তর্গত আফসানা নামক স্থানে।

ইবনে সিনার পূর্ণ নাম আবু আলি আল-হুসাইন ইবন আবদুল্লাহ ইবন সিনা। তাঁর উপাধি ছিল আল-শাইখ আল-রইস।

তিনি ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, দার্শনিক, পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, গণিতবিদ, যুক্তিবিদ, মনোবিজ্ঞানী, কবি এবং ইসলামি চিন্তাবিদ। জ্ঞানের প্রায় সব শাখায় তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনি প্রায় ১৬টি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে ১৫টি গ্রন্থে বিভিন্ন রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা-পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তবে যে গ্রন্থটি তাঁকে অমর করে রেখেছে, তার নাম “আল-কানুন ফি-তিব্ব”।

এই গ্রন্থটি ছিল ৫ খণ্ডে বিভক্ত এবং প্রায় ৮০০ পরিচ্ছেদে সংকলিত। এটি এশিয়া ও ইউরোপে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রধান পাঠ্যগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইউরোপে গ্রন্থটি “Bible of Medicine” (চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইবেল) নামে পরিচিত ছিল।

এই অসামান্য অবদানের জন্য অনেকেই ইবনে সিনাকে “Doctor of Doctors” (চিকিৎসকদের চিকিৎসক) বলে অভিহিত করেছেন।

এই চিকিৎকদের চিকিৎসক ১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দে (৪২৮ হিজরী) মৃত্যুবরণ করেন।

৩. হাসান ইবনুল হায়সাম

হাসান ইবনুল হাইসাম, যাঁর অবদান আধুনিক ক্যামেরা আবিষ্কারের পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে তিনিই ক্যামেরার মূল ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ইবনুল হাইসামের জন্ম ৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে, ইরাকের বাসরা নগরীতে। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী।

১০২১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রথমবারের মতো পিনহোল ক্যামেরার ধারণা উপস্থাপন করেন। ইবনুল হাইসাম বিশ্ববাসীকে দেখান যে আমরা দেখতে পাই কারণ আলো চোখে প্রবেশ করে, চোখ থেকে আলো বের হয় না—যা সে সময়ের প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।

তিনি আবিষ্কার করেন, আলো যদি একটি ছোট ছিদ্র বা ফোকাস পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করে, তাহলে তা একটি উল্টো চিত্র তৈরি করে। এই ধারণার ভিত্তিতেই তিনি পিনহোল ক্যামেরা তৈরি করেন।

পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালে, কোডাক কোম্পানির প্রকৌশলী স্টিভেন স্যাসন প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা উদ্ভাবন করেন, যা ক্যামেরা প্রযুক্তিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

ইবনে আল-হাইসাম আলোকবিদ্যায় অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি চিত্র এঁকেছেন, বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন এবং গাণিতিক সূত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসব গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তিনি সাত খণ্ডের বিখ্যাত গ্রন্থ “কিতাব আল-মানাজির” রচনা করেন। প্রায় এক হাজার বছর আগে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি আলোকবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।

তৎকালীন ইউরোপে আলোকবিদ্যা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা ছিল না। পরবর্তীকালে তাঁর এই গ্রন্থটি দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতকে লাতিন ভাষায় “De Aspectibus” নামে অনূদিত হয় এবং ইউরোপীয় বিজ্ঞানচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলে।

ইবনে আল-হাইসাম ছিলেন পরীক্ষা-নিরীক্ষাভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ। তিনি কেবল তত্ত্ব নয়, বরং পরীক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। এক হাজার বছর আগে একজন এক্সপেরিমেন্টাল বিজ্ঞানী হওয়া ছিল সত্যিই অভাবনীয়।

ইবনে আল-হাইসাম ১০৪০ খ্রিষ্টাব্দে (৪৩০ হিজরি) প্রায় ৭৫ বছর বয়সে মিসরের কায়রোতে ইন্তেকাল করেন।

৪. উমর খৈয়াম

আবুল ফাতেহ উমর ইবনে খৈয়াম ছিলেন সেলজুক যুগের একজন প্রখ্যাত গণিতবিদ, কবি ও জ্যোতির্বিদ। ওমর খৈয়ামের জন্ম ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ মে, সেলজুক সাম্রাজ্যের অন্তর্গত (বর্তমান ইরান অঞ্চলে)।

এই ইরানি গণিতবিদ মাত্র ২২ বছর বয়সে “Treatise on Demonstration of Problems of Algebra” নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের একটি নতুন পদ্ধতি উপস্থাপন করেন, যেখানে বৃত্ত, প্যারাবোলা ও অন্যান্য জ্যামিতিক রূপ ব্যবহার করে তিনি অসাধারণ অবদান রাখেন।

শুধু তাই নয়, উমর খৈয়াম দ্বিপদী বিস্তৃতি (Binomial Expansion) নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। এছাড়াও

  • সৌর বছরের দৈর্ঘ্য নির্ণয়
  • ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্যের সমালোচনা
  • ক্যালেন্ডার সংস্কার

ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

উমর খৈয়াম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বছরের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করেন। তাঁর হিসাবে এক বছরের দৈর্ঘ্য ছিল
৩৬৫.২৪২১৯৮৫৮১৫৬ দিন। তাঁর প্রবর্তিত এই ক্যালেন্ডারে প্রায় ,৫০০ বছরে মাত্র এক ঘণ্টার গড়মিল ঘটে, যা আধুনিক ক্যালেন্ডারের তুলনায়ও অত্যন্ত নির্ভুল।

উমর খৈয়ামের ৯৭১তম জন্মবার্ষিকীতে, তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গুগল ডুডল তৈরি করে তাঁকে সম্মান জানায়।

এই মহান বিজ্ঞানী ও কবি ১১৩১ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন

৫. আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান আল-আযদীর

আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান ছিলেন একজন বিখ্যাত মুসলিম বহুবিদ্যাবিশারদ। তাঁর জন্ম ৭২১ খ্রিষ্টাব্দে, পারস্যের তুস নগরীতে।

তাঁকে সাধারণত “রসায়নের জনক” বলা হয়। তিনি প্রাচীন আলকেমিকে একটি সুসংগঠিত বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলায় রূপান্তরিত করেন। তিনি পাতন (distillation), স্ফটিকীকরণ (crystallization) এবং পরিস্রাবণ (filtration)-এর মতো পরীক্ষণভিত্তিক পদ্ধতির প্রবর্তন করেন, যা আধুনিক রসায়নের ভিত্তি স্থাপন করে।

জাবির ইবনে হাইয়ান সালফিউরিক অ্যাসিড (sulfuric acid)-সহ বিভিন্ন অ্যাসিড আবিষ্কার ও প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রসায়নের পাশাপাশি তিনি ঔষধবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রকৌশল ও দর্শনশাস্ত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

কেবল চিকিৎসা বিষয়েই জাবির প্রায় ৫০০টি গ্রন্থ রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রসায়নবিদদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। রসায়ন বিজ্ঞানের জনক জাবির ইবনে হাইয়ানের রচিত ‘কিতাবুস সুসুম’ (Book of Poisons) আরব ঔষধবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

এই মহান বিজ্ঞানী ৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

চলবে…..