একজন মহামানব আসবেন—যিনি হবেন আখেরি নবী, যিনি হবেন সমস্ত মানবজাতির মুক্তির দিশারী। লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করবে, কিন্তু তিনি সবাইকে ভালোবাসবেন। তাঁর আগমন সম্পর্কে পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে অসংখ্য ভবিষ্যদ্বাণী। ইহুদি রাব্বাই, সাদুকি ও খ্রিস্টান পাদ্রিরা ছিলেন সেইসব কিতাবের পণ্ডিত। তারা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় ছিল—কবে আসবেন সেই মহামানব।
কিন্তু তিনি যখন বাস্তবে এলেন, তখন সেই পণ্ডিতদের অধিকাংশই তাঁকে চিনতে ব্যর্থ হলো। তাদের অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করল। এমনকি কেউ কেউ তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রও করল। তবে এই অগণিত ধর্মযাজকদের মাঝে একজন ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে শৈশবকালেই দেখামাত্র চিনে ফেলেছিলেন। তিনি শিশু মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাঝেই খুঁজে পেয়েছিলেন সেই প্রতিশ্রুত মহামানবের বৈশিষ্ট্য। খুঁজে পেয়েছিলেন কিছু অলৌকিক নিদর্শন। অতঃপর তিনি নিশ্চিতভাবে বলেছিলেন,
“এই বালকই হতে যাচ্ছে প্রতিশ্রুত সেই শেষ মহামানব।”
তার এই ভবিষ্যদ্বাণীর বহু বছর পর, যখন সেই ধর্মযাজক আর বেঁচে ছিলেন না, তখন এই কথাগুলো সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কে ছিলেন সেই ধর্মযাজক? কীভাবে এক বালককে দেখামাত্র তিনি তার ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছিলেন? কী এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তার সঙ্গে? কী এমন নবুয়তের চিহ্ন তিনি শিশু মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন?
ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিতদের অনেকেই জানতেন—শীঘ্রই আরব ভূমিতে একজন মহামানবের আবির্ভাব ঘটতে চলেছে। তিনি হবেন নবী-রাসূলদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। যদিও তাওরাত ও ইঞ্জিল গ্রন্থ ততদিনে অনেকটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, তথাপি সেই প্রতিশ্রুত মহামানব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণীগুলো তখনও রয়ে গিয়েছিল। আর এসব ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর ভরসা করেই খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মযাজকেরা সেই মহামানবের প্রতীক্ষায় ছিলেন।
এই অপেক্ষমাণ ধর্মযাজকদের মধ্যে একজন ছিলেন বাহীরা। তাঁর আসল নাম ছিল জর্জিস। তবে বাহীরা বা বুহাইরা নামেই তিনি অধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক এবং ইঞ্জিল ও পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। পরিণত বয়সে তিনি সিরিয়ার বুসরা নগরীর একটি গির্জায় পাদ্রি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বুহাইরা ছিলেন একজন সত্যিকার ধর্মপ্রাণ মানুষ। তিনি দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে অধিকাংশ ইহুদি ও খ্রিস্টান নবী-রাসূলদের শিক্ষা থেকে বহু দূরে সরে গেছে। আর গোটা আরব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মূর্তিপূজা। অন্যায়, অশান্তি ও পাপাচারে ভরে গিয়েছিল গোটা পৃথিবী। তিনি দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে অপেক্ষা করছিলেন—কবে আসবেন সেই মহামানব, যার হাত ধরে এই দুরবস্থার অবসান ঘটবে।
সিরিয়ার বুসরা শহরের সেই গির্জায় তাঁর অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হতো সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তৎকালীন বিশ্বে সিরিয়া ছিল এক সম্পদশালী ভূখণ্ড। এটি ছিল পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। আরবের মানুষ, বিশেষ করে মক্কার লোকেরা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে নিয়মিত সিরিয়ায় যাতায়াত করত।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু তালিবও মাঝেমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে সিরিয়ায় যেতেন। আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে লালিত-পালিত হন। তিনি তাঁকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে লালন-পালন করেন। শিশু মুহাম্মাদ (সা.)-ও বিভিন্ন কাজে তাঁর চাচাকে সহযোগিতা করতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স যখন মাত্র বারো বছর, তখন আবু তালিব এক কাফেলার সঙ্গে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যযাত্রায় রওনা হন। যাত্রার প্রাক্কালে বালক মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সঙ্গে যাওয়ার আবদার করেন। স্নেহবিগলিত চাচা সেই আবদার উপেক্ষা করতে পারেননি। তিনি বললেন,
“আমি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তাঁকে রেখে আমি কখনো কোথাও যাব না।”
মক্কা থেকে সিরিয়া ছিল বহু দূরের পথ। এই দীর্ঘ যাত্রার অধিকাংশ পথ ছিল উত্তপ্ত মরুভূমি। সেখানে ছিল না কোনো বৃক্ষের ছায়া, ছিল না পর্যাপ্ত পানির উৎস। এই দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা যখন বুসরা এলাকায় পৌঁছায়, তখন তারা সেখানে যাত্রাবিরতি করে।
যখন বাহীরা জানতে পারেন যে কুরাইশদের কাফেলা—আবু তালিব ও বালক মুহাম্মাদ (সা.)-সহ—তাঁর গির্জার পাশে অবস্থান করছে, তখন তিনি তাদের জন্য প্রচুর খাদ্যের ব্যবস্থা করেন।
বাহীরা তাঁর গির্জায় বসেই একটি আশ্চর্য ঘটনা লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন—সমগ্র কাফেলার মধ্যে একমাত্র বালক মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপরই আকাশ থেকে একটি মেঘ ছায়া দিয়ে চলেছে। পরে তারা যখন একটি গাছের নিচে যাত্রাবিরতি করে, তখন সেই মেঘ ও গাছের ডালপালা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ঝুঁকে ছায়া দিতে থাকে।
এই দৃশ্য দেখে বাহীরা গির্জা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং লোক পাঠিয়ে কাফেলার সবাইকে ডেকে বলেন,
“হে কুরাইশ বণিকগণ, আমি আপনাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছি। আপনাদের মধ্যে ছোট-বড়, দাস বা মনিব—সবাইকে এসে খাবার গ্রহণ করার অনুরোধ করছি।”
কুরাইশদের একজন বলল,
“হে বাহীরা, আজ আপনি তো নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন! এর আগে বহুবার আমরা আপনার পাশ দিয়ে যাতায়াত করেছি, কিন্তু কখনো আপনি আমাদের এমনভাবে আপ্যায়ন করেননি। আজ এর কারণ কী?”
বাহীরা বললেন,
“আপনার কথা ঠিক। আগে আমি কখনো এমন করিনি। তবে আজ আপনারা আমার অতিথি। তাই আমি চাই আপনাদের সেবা করতে।”
সবাই খাবার গ্রহণের জন্য উপস্থিত হলো। কিন্তু অল্পবয়স্ক হওয়ায় রাসূলুল্লাহ (সা.) কাফেলার মালপত্রের কাছে গাছের ছায়ায় বসে রইলেন।
বাহীরা অতিথিদের দিকে লক্ষ্য করে দেখলেন—যে বৈশিষ্ট্যগুলো তিনি বালক মুহাম্মাদ (সা.)-এর মধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন, সেগুলো উপস্থিত অন্য কারও মধ্যে নেই। তখন তিনি বললেন,
“হে কুরাইশীগণ, তোমাদের কেউই যেন আমার আতিথেয়তা থেকে বাদ না পড়ে।”
তারা বলল,
“একজন বালক ছাড়া সবাই এসেছে। সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ।”
বাহীরা বললেন,
“না, তাকে বাদ দেবে না। তাকেও ডেকে আনো।”
একজন কুরাইশী বলল,
“লাত ও উজ্জার শপথ! আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র আমাদের সঙ্গে থাকবে অথচ আমাদের সঙ্গে খাবার খাবে না—এটা হতে পারে না।”
সে উঠে গিয়ে বালক মুহাম্মাদ (সা.)-কে নিয়ে এলো এবং সবাই মিলে খাবারে বসলো।
এই সময় বাহীরা গভীর মনোযোগে তাঁর অবয়ব পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। অতিথিদের খাওয়া শেষ হলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কথা বললেন, তাঁর ঘুম, চরিত্র ও দৈহিক গঠন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সব উত্তর তাঁর পড়া কিতাবের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে গেল।
অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পিঠ দেখলেন। দুই কাঁধের মাঝখানে নবুয়তের মোহর দেখে তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন।
এরপর তিনি আবু তালিবকে বললেন,
“এই বালকটি আপনার কী?”
আবু তালিব বললেন,
“আমার ছেলে।”
বাহীরা বললেন,
“না, সে আপনার ছেলে নয়। তার পিতা জীবিত নেই।”
আবু তালিব বললেন,
“সে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র।”
সব শুনে বাহীরা বললেন,
“এই বালককে নিয়ে দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যান। ইহুদিদের থেকে তাকে সাবধানে রাখবেন। আল্লাহর কসম, তারা যদি এ বালককে চিনে ফেলে, তবে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। কেননা অচিরেই সে এক মহান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।”
এরপর আবু তালিব রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে দ্রুত মক্কায় ফিরে যান।
