রাসুল (সা.)-এর জীবনের বড় বড় পাঁচটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ (শেষ পর্ব)

‘আব্দুল্লাহ (রা.)’-এর শাহদাতের পর ‘ছাবেত ইবনে আরকাম (রা.)’ পতাকা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, “হে মুসলমানরা, তোমারা উপযুক্ত একজনকে সেনাপতির দায়িত্ব দাও” ।

সাহাবিরা ‘ছাবেত (রা)-কেই সেনাপতির দায়িত্ব নিতে বললে তিনি বলেন,“আমি একাজের উপযুক্ত নই” ।

এরপর সাহাবিরা পরামর্শ করে ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)’-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। (এই প্রথম বারের মতো ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)’ মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন) । তিনি নেতৃত্ব গ্রহণের পর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। 

 ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)’ থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, “মুতার যুদ্ধের দিনে আমার হাতে একে একে ৯টি তলোয়ার ভেঙ্গেছে। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনী ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিলো” ।

এদিকে ‘রাসূল (সা.)’ রণক্ষেত্রের খবর লোক মারফত পৌঁছার আগেই ওহীর মাধ্যমে পান। তিনি বলেন, ‘যায়েদ’ পতাকা গ্রহণ করেছিলেন, তিনি শহীদ হন। এরপর ‘জাফর’ পতাকা গ্রহণ করেছিলেন তিনি শহীদ হন। এরপর ‘আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহা’ পতাকা গ্রহণ করেছিলেন, তিনিও শহীন হন। ‘রসূল (সা.)’-এর চোখ এ সময় অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, এরপর পতাকা গ্রহণ করেন আল্লাহর তলোয়ার সমূহের মধ্যে একটি তলোয়ার।

যুদ্বের সমাপ্তি

মুসলমানদের মাত্র তিন হাজার সৈন্য দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের সামানে টিকে থাকা ছিলো এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। মুতার যুদ্ধে তিনজন সেনাপতি সহ ১২জন শহিদ হন অন্য দিকে রোমানদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল মুসলিমদের তুলনায় বহুগুণ বেশি কিন্তু তাঁরা ছিল অগণিত। যদিও সাহাবিরা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তাঁরা উপলব্ধি করতে পারে কোন কিছুর বিনিময়ে বিজয় অর্জন করা সম্ভব না।

সার্বিক পরিস্তিতি বিবেচনা করে পরদিন সকালে তাঁরা আর যুদ্ধে না জড়িয়ে মদীনায় ফিরতি যাত্রা করেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না যুদ্ধ শেষ না করেই তাদের এই ফিরতি যাত্রা কিভাবে নেবেন ‘রাসূল (সা.)’। মুসলিম বাহিনী যখন মদীনার প্রবেশ পথে তখন মদীনার মানুষ তাদের তিরস্কার করতে থাকে। তাঁরা চিৎকার করে বলতে থাকে, “তোমার আল্লাহর পথ থেকে পালিয়ে এসেছ”

কিন্ত ‘রাসূল (সা.)’ তাঁদেরকে নিনৃত্ত করে বলে, “তাঁরা পালিয়ে আসেনি। আল্লাহর ইচ্ছে হলে তাঁরা আবার সেখানে যাবে” ।

‘রাসূল (সা.)’ ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)’-এর কাধে হাত রেখে বলেন, “হে সুলাইমানের পিতা আজ তুমি যে বীরত্বের পরিচয় দেন, ইতিহাসে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না” ।

এরপর ‘রাসূল (সা.)’ উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘খালিদ’ হলো ‘সাইফুল্লাহ’ তথা ‘আল্লাহর তলোয়ার’’

মুতার যুদ্ধের প্রভাব

যে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মুতা অভিযান পরিচালিত হয়েছিলো, সেটা সম্ভব না হলেও এ যুদ্ধের ফলে মুসলমানদের সুনাম সুখ্যাতি বহু দূর বিস্তার লাভ করে। কেননা, রোমানরা ছিলো সে সময়ের শ্রেষ্ঠ শক্তি। আরবরা মনে করতো যে, রোমানদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া মানে আত্মহত্যার শামিল। কাজেই, উল্লোখযোগ্য বড় ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তিনহাজার সৈন্য দুইলাখ সৈন্যের মোকাবেলায় আরবের জনগণ বুঝতে সক্ষম হয়েছিলো যে, ইতিপূর্বে পরিচিতি সকল শক্তির চেয়ে মুসলমানরা সম্পূর্ণ আলাদা। মুতার যুদ্ধের পর মুসলমানদের চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু গোত্র ইসলামের ছায়াতলে আসে।

খন্দকের যুদ্ধ

ওহুদ যুদ্ধের শেষে আবু সুফিয়ান প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে পরের বছর তারা আবার মদিনা আক্রমণ করবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও পরের বছর তিনি আর মদিনা আক্রমণের জন্য সেনাদল প্রস্তুত করেননি। এমন সময় ইহুদিদের কয়েকজন নেতা মক্কায় কুরাইশদের কাছে উপস্থিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের প্ররোচিত করে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। কুরাইশরাও এতে সম্মত হয়ে যায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী কুরাইশ, কেনানা ও তোহামাসহ অন্যান্য মিত্র গোত্র মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তাদের নেতা ছিল কাফিরদের সর্দার আবু সুফিয়ান। পথে বনু সালিম, সাতফান, ফাজারাহ, বনু আশজা সহ আরও বহু গোত্র কুরাইশ বাহিনীতে যোগ দেয়। এতে সম্মিলিত সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ হাজারে। এই বিশাল বাহিনীর আকার এত বড় ছিল যে, মদিনার নারী-শিশুসহ মোট জনসংখ্যাও এর সমান ছিল না। যদি এই বাহিনী হঠাৎ মদিনায় আক্রমণ চালাত, তাহলে মুসলমানদের জন্য তা হতো ভয়াবহ বিপদের কারণ।

এই সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে শূরার বৈঠকে বসেন এবং মদিনার প্রতিরক্ষার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে হযরত সালমান ফারসি (রা.)-এর একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। তিনি বলেন, পারস্যে শত্রু দ্বারা ঘেরাও হলে চারদিকে পরিখা খনন করা হতো। এটি ছিল একটি সুচিন্তিত ও অভিনব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা আরবরা আগে কখনো ব্যবহার করেনি।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই প্রস্তাব অনুমোদন করে সঙ্গে সঙ্গে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। সাহাবিদের দশজন করে দলে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি দলকে চল্লিশ হাত দীর্ঘ পরিখা খননের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুসলমানরা গভীর মনোযোগ ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজে লেগে যান, আর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও এই কঠোর শ্রমে অংশগ্রহণ করেন।

পরিখা খননের সময় এক জায়গায় একটি বিরাট পাথর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোদালের আঘাতে তা ভাঙা যাচ্ছিল না। তখন সাহাবিরা বিষয়টি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে জানান। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আঘাত করলে পাথরের একাংশ ভেঙে যায়। তখন তিনি বলেন, তাঁকে শাম দেশের চাবি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় আঘাতে তিনি বলেন, তিনি মাদায়েনের শ্বেত প্রাসাদ দেখতে পাচ্ছেন। তৃতীয় আঘাতে তিনি ঘোষণা করেন, আল্লাহ তাঁকে ইয়েমেনের চাবি দিয়েছেন এবং তিনি সানআর ফটক দেখতে পাচ্ছেন। এই ভবিষ্যদ্বাণী সাহাবিদের মনোবল আরও দৃঢ় করে তোলে।

পরিখা খনন শেষ হতেই কুরাইশ বাহিনী এসে উপস্থিত হয় এবং রুমা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) তিন হাজার মুসলিম সৈন্য নিয়ে ‘সালা’ নামক পাহাড়কে পেছনে রেখে অবস্থান নেন। পরিখাটি দুই বাহিনীর মাঝে এক অটল প্রতিরক্ষা দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।

জোট বাহিনী এসে দেখে যে একটি গভীর ও প্রশস্ত পরিখা তাদের অগ্রযাত্রা রোধ করে রেখেছে। তারা আগে কখনো এমন কৌশলের মুখোমুখি হয়নি। ইকরামা ইবনে আবু জাহেলের নেতৃত্বে একটি দল সংকীর্ণ একটি স্থান দিয়ে পরিখা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। তাদের মধ্য থেকে আমর ইবনে আবদে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানালে হযরত আলী (রা.) তার মোকাবিলা করেন এবং তাকে যুদ্ধে পরাজিত করে হত্যা করেন।

এরপর আবু সুফিয়ান কূটনীতির আশ্রয় নেয়। সে বনু নাযির গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবকে সঙ্গে নিয়ে বনু কুরাইযা গোত্রের কাছে যায় এবং তাদের সর্দার কা‘ব ইবনে আসাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়। এই কা‘ব ইবনে আসাদই আগে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন যে যুদ্ধের সময় তিনি মুসলমানদের সাহায্য করবেন। হুয়াই দরজায় উপস্থিত হলে কা‘ব প্রথমে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নানা প্ররোচনামূলক কথাবার্তার মাধ্যমে হুয়াই শেষ পর্যন্ত কা‘বকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয় এবং চুক্তি ভঙ্গ করতে রাজি করায়।

এদিকে হযরত নাঈম ইবনে মাসউদ (রা.) গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে বনু কুরাইযা ও কুরাইশদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেন। এর ফলে ইহুদি ও কুরাইশদের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নেয় এবং তাদের ঐক্য ভেঙে পড়ে।

অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় কাফির বাহিনীর মধ্যে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তাদের ঘোড়া ও উট মারা যেতে থাকে। এমন অবস্থায় এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়, যা তাদের শিবির সম্পূর্ণভাবে তছনছ করে দেয়। এই দুরবস্থায় আবু সুফিয়ান অবরোধ তুলে নিয়ে মক্কার পথে পলায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

পরদিন ভোরে মুসলমানরা দেখতে পান শত্রু শিবির সম্পূর্ণ ফাঁকা। তবে এবার তারা আর পরিখা অতিক্রম করে কুরাইশদের পরিত্যক্ত আসবাবপত্র লুট করতে বের হননি। ওহুদের যুদ্ধে সংঘটিত মারাত্মক ভুলের স্মৃতি তখনও তাদের হৃদয়ে তাজা ছিল। হযরত মুহাম্মদ (সা.) একজন গুপ্তচর পাঠিয়ে নিশ্চিত হন যে কুরাইশরা সত্যিই ফিরে গেছে। এরপর তিনি সবাইকে মদিনায় ফিরে আসার নির্দেশ দেন।

খন্দকের যুদ্ধ ছিল একটি সিদ্ধান্তমূলক ও ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুসলমানদের মনোবল বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং কাফিরদের শক্তি চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ে। ইসলাম রক্ষায় এই যুদ্ধ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) যথার্থই বলেছিলেন, “এবার আমরা ওদের ওপর আক্রমণ করব, ওরা আর আমাদের ওপর আক্রমণ করতে পারবে না।”

মক্কা বিজয়

হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়ত লাভের পর তার নিজের জন্মভূমি মক্কার কুরাইশরা তার সবচেয়ে বড় বিরোধিতা করে। নবুয়ত লাভের মাত্র ১৩ বছর পর তিনি ইয়াসরিবে (বর্তমান মদিনা) হিজরত করতে বাধ্য হন। তবে হিজরতের পরও কুরাইশরা তাদের ষড়যন্ত্র বন্ধ করেনি এবং একে একে বদর, ওহুদ ও খন্দক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

হুদাইবিয়ার সন্ধি ও চুক্তি ভঙ্গ

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মদিনার মুসলিমদের সঙ্গে মক্কার কুরাইশদের ১০ বছরের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যেকোনো গোত্র মুসলিমদের বা কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পারত। বনু খোজাআ গোত্র মুসলিমদের পক্ষে এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের পক্ষে চুক্তিবদ্ধ হয়। দীর্ঘদিনের শত্রুতার কারণে কুরাইশরা বনু বকর গোত্রকে উসকে দিয়ে বনু খোজাআ গোত্রের ওপর আক্রমণ চালায় এবং তাদের বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। কুরাইশরা ভেবেছিল, এই ষড়যন্ত্র তাদের বিরুদ্ধে যাবে না, কিন্তু সত্য প্রকাশ পেয়ে যায়।

খোজাআ গোত্রের এক প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে বিচার চায়। রাসুল (সা.) তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্ত পাঠান:

১. বনু খোজাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ দিতে হবে। ২. বনু বকর গোত্রের সঙ্গে কুরাইশদের মৈত্রী চুক্তি বাতিল করতে হবে। ৩. হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল করতে হবে এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

কুরাইশ নেতারা তৃতীয় শর্ত গ্রহণ করে, যার ফলে হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন।

মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি

হজরত মুহাম্মদ (সা.) আনসার, মুহাজির এবং নব-মুসলিম গোত্রদের একত্রিত করে ১০,০০০ সৈন্য নিয়ে যাত্রা করেন। ৮ হিজরির ১০ রমজান, মুসলিম বাহিনী মার-উজ-জাহরান উপত্যকায় পৌঁছে। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান তখন যুদ্ধ এড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে পড়েন এবং নবী (সা.)-এর চাচা আব্বাস (রা.)-এর মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর শিবিরে আসেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মক্কার জনগণের জন্য নিরাপত্তা চান। রাসুল (সা.) ঘোষণা দেন:

  • যারা অস্ত্র তুলবে না, তারা নিরাপদ।
  • যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ।
  • যারা নিজ নিজ ঘরে থাকবে, তারা নিরাপদ।
  • যারা কাবায় আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ।

মক্কা বিজয়

১১ ডিসেম্বর ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে (১৮ রমজান ৮ হিজরি) মুসলিম বাহিনী চার ভাগে বিভক্ত হয়ে মক্কায় প্রবেশ করে।

  • প্রথম সারির নেতৃত্ব দেন আবু উবাইদুল্লাহ ইবনে জাররাহ (রা.)।
  • দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব দেন আল-যুবায়ের (রা.)।
  • তৃতীয় সারির নেতৃত্ব দেন আলী (রা.)।
  • চতুর্থ সারির নেতৃত্ব দেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)।

তিনটি বাহিনী রক্তপাতহীনভাবে প্রবেশ করে, কিন্তু খালিদের বাহিনীর সামনে কিছু কট্টর কুরাইশ যোদ্ধা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর ১২ জন কুরাইশ নিহত এবং ২ জন মুসলিম শহীদ হন।

কাবা থেকে মূর্তি অপসারণ

মক্কায় প্রবেশের পর হজরত মুহাম্মদ (সা.) কাবা শরিফে প্রবেশ করেন এবং সেখানে থাকা ৩৬০টি মূর্তি ধ্বংস করেন। তিনি তখন কোরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করেন:

“সত্য এসেছে, আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (সুরা আল-ইসরা: ৮১)

এরপর বেলাল (রা.) কাবার ছাদে উঠে প্রথমবারের মতো আজান দেন।

সাধারণ ক্ষমা ও ন্যায়বিচার

মক্কার জনগণ কাবার সামনে সমবেত হলে রাসুল (সা.) বলেন:

“হে কুরাইশগণ, তোমাদের প্রতি আমার কী আচরণ করা উচিত বলে মনে করো?”

তারা বলল,

“করুণা, হে আল্লাহর নবী। আমরা আপনার কাছ থেকে ভালো ছাড়া কিছুই আশা করি না।”

রাসুল (সা.) বললেন,

“আমি তোমাদের ঠিক তাই বলবো যা নবী ইউসুফ (আ.) তার ভাইদেরকে বলেছিলেন। আজ তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই; তোমরা মুক্ত।”

তিনি সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে যুদ্ধপরাধী হিসেবে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের মধ্য থেকে ৬ জনকে হত্যা করা হয় এবং বাকিদের ক্ষমা করা হয়। যারা ক্ষমা চেয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, তাদেরও মুক্তি দেওয়া হয়।

এভাবে হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমার এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি চাইলে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে ইসলামের উদারতা ও মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ স্থাপন করেন।

সমাপ্ত