হিদায়াত মানবজীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। হিদায়াতপ্রাপ্তিতে মানুষের কোনো হাত নেই। ‘আল্লাহ’ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন। তিনি বলেন,
“আপনি যাকে ভালোবেসেছেন তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না; কিন্তু ‘আল্লাহ’ তাআলা যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন।”
(সুরা কাসাস, আয়াত: ৫৬)
এ জন্য দেখা যায়, নবীর পরিবারের সদস্য হয়েও হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়েছে অনেকে। এমন কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরা হলো—
১. ‘আদম (আ.)’-এর ছেলে: ‘আদম (আ.)’-এর ছেলে ‘কাবিল’ নবীর ঘরে জন্মেও ঈমান লাভ করতে পারেনি। সে তার নিজের ভাই ‘হাবিল’কে হত্যা করে। পবিত্র কোরআনে তার পাপের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে,
“পরিশেষে তার মন তাকে ভ্রাতৃহত্যায় প্ররোচিত করল। সুতরাং সে তার ভাইকে হত্যা করে ফেলল এবং অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”
(সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩০)
২. ‘নুহ (আ.)’-এর ছেলে: ‘নুহ (আ.)’-এর প্রত্যাখ্যানকারীদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ও এক পুত্রও ছিল। কোরআনে এ ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে,
“আমি বললাম, তুমি তাতে প্রত্যেক যুগল হতে দুটি করে তুলে নাও। যাদের প্রতি আগেভাগেই শাস্তির কথা নিশ্চিত হয়ে গেছে তাদের বাদে আপনার পরিবারের সদস্যদের এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের তুলে নিন। অবশ্য তাঁর সঙ্গে মাত্র স্বল্পসংখ্যক লোক ঈমান এনেছিল।”
(সুরা হুদ, আয়াত: ৪০)
বন্যা শুরু হলে ‘নুহ (আ.)’ আল্লাহকে ডেকে বললেন,
“হে আমার রব! নিশ্চয় আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং নিশ্চয় আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।”
(সুরা হুদ, আয়াত: ৪৫)
‘আল্লাহ’ বলেন,
“হে ‘নুহ’, সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়; সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ণ।”
(সুরা হুদ, আয়াত: ৪৬)
৩. ‘ইবরাহিম (আ.)’-এর পিতা: ‘ইবরাহিম (আ.)’-এর পিতা ছিলেন মূর্তিপূজারি ‘আজর’। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,
“হে আমার পিতা, আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি; সুতরাং আমার অনুসরণ কর, আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব।”
(সুরা মারিয়াম, আয়াত: ৪৩)
উত্তরে পিতা বলেন,
“হে ইবরাহিম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে আমি অবশ্যই পাথর মেরে তোমার মাথা চূর্ণ করে দেব। তুমি আমার সম্মুখ থেকে চিরতরের জন্য দূর হয়ে যাও।”
(সুরা মারিয়াম, আয়াত: ৪৬)
৪. ‘লুত (আ.)’-এর স্ত্রী: ‘আল্লাহ’র নবী ‘লুত (আ.)’-এর স্ত্রীকে জাহান্নামি বলা হয়েছে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,
“যারা কুফরি করে, আল্লাহ তাদের জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করছেন ‘নুহ’-এর স্ত্রী ও ‘লুত’-এর স্ত্রীর। তারা ছিল আমাদের বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে ‘নুহ’ ও ‘লুত’ তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারলেন না এবং তাদেরকে বলা হলো, তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ কর।”
(সুরা তাহরিম, আয়াত: ১০)
৫. ‘মহানবী (সা.)’-এর চাচা: চাচা ‘আবু তালিব’ ছিলেন ‘রাসুল (সা.)’-এর সংকটকালের আশ্রয়। তিনি ‘আবু তালিব’কে খুব ভালোবাসতেন এবং ‘আবু তালিব’ও তাঁকে প্রাণাধিক স্নেহ করতেন। কিন্তু এই ‘আবু তালিব’-এর ভাগ্যে হিদায়াত জোটেনি। ‘সাইদ ইবনে আল-মুসাইয়িব’ থেকে বর্ণিত,
“আবু তালিব মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলে ‘রাসুল (সা.)’ তাঁকে বললেন, ‘চাচাজান, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ একবার পড়ুন, তাহলে আমি আপনার জন্য আল্লাহর কাছে কথা বলতে পারব।’ কিন্তু ‘আবু জাহল’ ও ‘আবদুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়া’-এর প্ররোচনায় তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের ওপরেই আছি।’”
এরপরও ‘রাসুল (সা.)’ তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার ইচ্ছা করলে ‘আল্লাহ’ বলেন,
“নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তারা নিকটাত্মীয় হলেও, যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তারা জাহান্নামি।”
(সুরা তওবা, আয়াত: ১১৩)
চাচা ‘আবু তালিব’ আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনলেও, তিনি রাসুলকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন।