​​“ওসমান হাদি—এক অসমাপ্ত মহাকাব্যের তরুণ মহাবীরের নাম।”

ওসমান হাদি—যাঁর রাজনীতির মঞ্চে উত্থান ছিল যেমন আকস্মিক, তেমনই নাটকীয়ভাবে থেমে গেল তাঁর জীবন। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাত দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৮ই ডিসেম্বর মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চিরতরে বিদায় নেন শরিফ ওসমান হাদি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে যাঁর নাম খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিল—কখনো তীব্র সমর্থনে, কখনো প্রবল বিতর্কে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী। বাংলাদেশের রাজনীতির এক তরুণ পথপ্রদর্শক, এক আপোষহীন নেতা, একজন প্রতিবাদী তরুণ। বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, এক মহান দেশপ্রেমিক, কট্টর ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী নেতা, এক নির্ভীক যোদ্ধা।

তিনি কথা বলার সময় কোনো বড় রাজনৈতিক দলকেই ভয় পেতেন না। ছোটবেলা থেকেই যেকোনো অন্যায় দেখলেই তার প্রতিবাদ করতেন। জুলাই আন্দোলন ও স্বৈরাচারী হাসিনার পতনের পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। জুলাই আন্দোলনের পর অনেকে এটিকে বিক্রি বা বিকৃত করার চেষ্টা করলেও এসব থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলেন ওসমান হাদি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র হিসেবে শরিফ ওসমান হাদি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। জুলাই শহীদদের অধিকার রক্ষা, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সক্রিয় রাজনীতির কারণে হাদি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন।

কিন্তু এসব কাজই এক সময় তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মৃত্যুর আগে একাধিক নম্বর থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়, যার বেশির ভাগই ছিল ভারতীয় নম্বর।

১২ ডিসেম্বর দুপুরে জুমার নামাজ আদায় করে ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে ফেরার পথে রাজধানীর বিজয়নগরের কালভার্ট রোড এলাকায় কাপুরুষের মতো পেছন দিক থেকে ওসমান হাদিকে গুলি করে শয়তানেরা। একটি গুলি তাঁর মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতর আহত হন।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক চেষ্টার পরও তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় তিন দিন পর, ১৫ ডিসেম্বর, আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চললেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। টানা সাত দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর ১৮ ডিসেম্বর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেন।

শরিফ ওসমান হাদির রাজনৈতিক উত্থান মূলত ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর। এর আগে তিনি মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা ছিলেন না। শিক্ষাজীবন থেকেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও দলীয় রাজনীতিতে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা চোখে পড়েনি। তবে জুলাই অভ্যুত্থান তাঁকে নতুন পরিচয়ে সামনে নিয়ে আসে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিনি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য ছিল—আধিপত্যবাদের বিরোধিতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি। এখান থেকেই তিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগসহ নানা ইস্যুতে সোচ্চার বক্তব্য দিতে শুরু করেন।

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে ব্যাপক আলোচনায় নিয়ে আসে। একইভাবে গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের ওপর হামলার পর তাঁর প্রতিক্রিয়াও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর বক্তব্যের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকরা একে অশালীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বললেও সমর্থকদের একাংশ তাঁকে দেখেছেন নির্ভীক ও আপসহীন নেতা হিসেবে।

সামাজিক মাধ্যম ছিল শরিফ ওসমান হাদির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ফেসবুক লাইভ, পোস্ট ও ভিডিওর মাধ্যমে তিনি নিয়মিত নিজের অবস্থান তুলে ধরতেন। নির্বাচনী প্রচারণার নানা মুহূর্ত—লিফলেট বিতরণ, ভোররাতে মসজিদের সামনে উপস্থিতি, অর্থ সংগ্রহ কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথোপকথন—সবই তিনি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করতেন। এর অনেকগুলোই ভাইরাল হয়েছে এবং সৃষ্টি করেছে সমর্থন ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

ওসমান হাদির জন্ম ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়। মাদরাসা শিক্ষক বাবা মাওলানা আব্দুল হাদি ও গৃহিণী মা তাসলিমা হাদির ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। সীমিত আয়ের পরিবারের টিনশেডের ছোট ঘরেই কেটেছে তাঁর শৈশব। হাদির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায়। পরে ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসা থেকে দাখিল ও আলিম সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

ওসমান হাদি ছিলেন এ জাতির এক শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁর মৃত্যুতে নারী-পুরুষ, যুবক থেকে বৃদ্ধ—সবাই কেঁদেছে। ২০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত তাঁর নামাজে জানাজায় কয়েক লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

ওসমান হাদি ছিলেন জনমানুষের নেতা। তিনি সহজেই যে কারও সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। তাঁর কাছে ধনী-গরিব, সাদা-কালোর কোনো ভেদাভেদ ছিল না। নির্বাচনী প্রচারণায় বেরিয়ে তিনি যে কারও সঙ্গে কোলাকুলি করতেন—সে ধনী হোক বা গরিব। একসঙ্গে বসে গল্প করা, চা খাওয়া—সবই তিনি করতেন নির্দ্বিধায়।

খুনি ফয়সাল সম্পর্কে আমার এক কথা—
তুই হয়তো ভেবে ছিলি একজন হাদিকে শহীদ করে সব শেষ করে দিবি,
কিন্তু সব ভুল।
তুই একজন হাদিকে শহীদ করে লক্ষ-কোটি হাদিকে জাগিয়ে তুলেছিলি।

হাদির জানাযায় লক্ষ লক্ষ লোক হয়েছিল, মানুষ কেঁদেছিল।
আর আমার মনে হয়, তোর জানাযায় লোক খুঁজে পাওয়া যাবে কি না—সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।