বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার: অবহেলার এক করুণ কাহিনি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ—একটি জাতির বেঁচে থাকার লড়াই। কোটি মানুষের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছে এই দেশ। এই সংগ্রামের সর্বোচ্চ প্রতীক হয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন বাংলার সাত বীরশ্রেষ্ঠ, যারা নিজের জীবন দিয়ে কিনে এনেছিলেন স্বাধীনতার সূর্য। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন উঠছে—সেই সাত বীরের পরিবার কেমন আছে? রাষ্ট্র কি তাদের দায়িত্ব সত্যিই পালন করতে পেরেছে?

পরিবারগুলোর বক্তব্য শুনলে ঘুরেফিরে সেই একটি কথাই বারবার ফিরে আসে। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে ফুল আসে, ক্যামেরা আসে, বক্তব্য আসে। প্রশাসন, রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে তখন বাড়িগুলো ভরে ওঠে। কিন্তু দিন শেষ হলে, বছরের বাকি সময়গুলোতে তাদের খোঁজ রাখার মতো কেউ আর থাকে না।

ভোলার মৌটুপী গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগম ছিলেন রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক জীবন্ত প্রতীক। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি শ্বাসকষ্ট, গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে ভুগেছেন। সরকারি ভাতা পেতেন মাত্র ৯ হাজার টাকা। কিন্তু এই সামান্য ভাতা দিয়ে কোন মতে সংসার চালিয়ে জীবন কাটিয়েছেন এই বীরমাতা। এত কষ্টকর জীবনযাপনের পরও তাঁর কোনো অভিযোগ ছিল না। তিনি বলতেন—

“আমার নিজের জন্য কিছুই চাওয়ার নেই। সরকার শুধু আমাদের পরিবারের খোঁজ রাখলেই চলবে।”

তিনি আরও বলেন— “যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমাকে বলেছিল, ‘মা, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। আমার জন্য দোয়া করো। সবাই ফিরলেও আমি মনে হয় আর জীবিত ফিরে আসব না, মা। পরে তা সত্যিই হয়।”

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের পক্ষ থেকে ৯২ শতাংশ জমির ওপর একটি একতলা পাকা ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘শহীদ স্মরণিকা’। তখন থেকে এখানেই তাঁরা বসবাস করছেন। বর্তমানে বাড়িটির অবস্থা জীর্ণ হলেও কোনো মেরামতের ব্যবস্থা করা হয়নি।

এদিকেফরিদপুরের বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক মুন্সী আবদুর রউফের নামে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে মধুমতী নদী। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে এই বীরশ্রেষ্ঠের মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন। অথচ জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য কোনো স্মারক নেই। ফলে দর্শনার্থীরা এসে স্মারক না পেয়ে মন খারাপ করে ফিরে যান।

তাঁর পরিবারের অবস্থাও করুণ। পরিবারটি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছে। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের ছেলে অটোরিকশা চালিয়ে অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

এবারবীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান—যিনি ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন সদস্য—মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের দৃঢ় সংকল্পে একটি পাকিস্তানি বিমান ছিনতাই করে আকাশে উড়াল দেন। কিন্তু বিধিবাম, মাঝ আকাশেই লেখা হয় তাঁর ভাগ্য। শত্রুর গুলিতে বিমানটি ভূপাতিত হয় এবং তিনি শহীদ হন। অথচ তাঁর পৈতৃক ভিটা আজ চরম অবহেলায় পড়ে আছে। বীরশ্রেষ্ঠের নামে গ্রামের নামকরণের সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও তা এখনো কাগজে-কলমেই আটকে আছে। বর্তমানে তাঁর বাড়িতে কেউ বসবাস করেন না; দরজায় ঝুলছে তালা। সামনে লাগানো হয়েছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান যুবসংঘ’-এর সাইনবোর্ড। চারপাশের বাড়িগুলোতে বসবাস করেন তাঁর স্বজনরা।

নরসিংদীর রায়পুরায় তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার বহু বছর পরও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। গ্রন্থাগারে কিছু বই থাকলেও জাদুঘরে বীরশ্রেষ্ঠের কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের মাহমুদাবাদ বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত ‘বাংলার ঈগল’ স্মৃতিফলকটি ত্রিমুখী কালো পাথরের স্তম্ভে নির্মিত। একটি স্তম্ভে তাঁর প্রতিকৃতি, আরেকটিতে জীবনবৃত্তান্ত এবং তৃতীয়টি খোলা আকাশের প্রতীক হিসেবে ফাঁকা রাখা হয়েছে। মাঝখানে ত্রিভুজাকৃতির স্তম্ভে টেরাকোটায় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্য ফুটে উঠেছে। উপরে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরনগর গ্রামের প্রবেশ নির্দেশক।

এদিকেঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোর্দ খালিশপুর গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের বাড়ি সংস্কারের অভাবে আজ ধ্বংসের মুখে। গ্রামের নাম ‘হামিদনগর’ করার দীর্ঘদিনের দাবি আজও পূরণ হয়নি। কলেজসংলগ্ন তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি এখনো জাতীয়করণ হয়নি; সামান্য বেতনে মাত্র দুইজন কর্মচারী সেখানে কাজ করেন।

১৯৮১ সালে জন্মভিটায় নির্মিত একতলা ‘শহীদ স্মরণিকা’ বর্তমানে জরাজীর্ণ। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে; বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তাঁর তিন ভাই পরিবার নিয়ে এখানেই থাকেন এবং দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। বাড়ির সামনে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই—এটিও দীর্ঘদিনের দাবি। বাড়ির আঙিনায় অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের বাবার কবরটিও দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে ছিল। পরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কবরটি পাকা করে দেওয়া হয়।

এরপর বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের জন্মভিটা দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। স্বজন ও স্থানীয়রা জায়গাটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত করেছেন। একাধিকবার সংস্কারের আবেদন করা হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

২০০৮ সালে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের অবস্থাও করুণ। একজন কেয়ারটেকার দিয়ে কোনোমতে পরিচালিত হচ্ছে। ভেতরের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ভবনগুলো জরাজীর্ণ। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে গ্রন্থাগার, স্মৃতি জাদুঘর, জন্মভিটা ও তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়—সবকিছুই বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে। আশ্বাস থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

এরপরনোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পৈতৃক বাড়ি বেহাল দশায় এবং ব্যবহার অনুপযোগী। তাঁর ছোট ছেলে শওকত আলী পাটোয়ারী চরম অবহেলা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কখনো চায়ের দোকানে পানি টেনে, কখনো করাতকলে কাজ করে পরিবার চালাতে হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর নৌবাহিনীর উদ্যোগে নির্মিত তিন কক্ষের একতলা দালানে তিনি থাকেন। বর্তমানে ছাদ থেকে পানি পড়ে, প্লাস্টার খসে যাচ্ছে—বসবাসের অনুপযোগী। সংস্কারের অর্থ নেই। তাঁর একমাত্র আয় ভাতা হিসেবে পাওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকা; এতে পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। বাড়ির সামনে নির্মিত জাদুঘর ও পাঠাগারটিও বেহাল।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামটি একসময় তাঁর নামে থাকলেও পরে নাম পরিবর্তন করা হয়। কক্সবাজারের কাছে নির্মিত স্টেডিয়ামটির নাম তাঁর নামে করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অন্য নামে নামকরণ করা হয়।

তাছাড়াও বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের নামে নড়াইলে নেওয়া অনেক উদ্যোগ আজও অসম্পূর্ণ। ২০০৮ সালে ‘মহিষখোলা’ গ্রামের নাম গেজেটভুক্ত হয়ে ‘নূর মোহাম্মদনগর’ হয়। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখনো এমপিওভুক্ত নয়। শিক্ষকরা ১২ বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করছেন।

২০০৮ সালে জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি অরক্ষিত ও সমস্যায় জর্জরিত। কমপ্লেক্সের সামনে গরু চরানো, কাপড় ও ধান শুকানোর কাজ চলছে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগের নিদর্শন স্থাপনকারী বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার খুব কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করলেও মুক্তিযুদ্ধ তথা চেতনা ব্যবসায়ীরা কিন্তু খুব ভালোই আছে। জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবির আর মুনতাসির মামুনের মতো লোকেরা যুদ্ধের সময় তাগড়া জোয়ান হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। জাফর ইকবাল ছারছিনা পীর সাহেবের দরবারে বসে তাবারক খেয়েছে, শাহরিয়ার কবির ’৭১-এ পাকবাহিনীকে মুরগি সাপ্লাই দিত। মুনতাসির মামুন যুদ্ধে যাওয়ার বয়স থাকা সত্ত্বেও অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু এরাই আজ স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যশ, খ্যাতি আর সম্মাননা পাচ্ছে, আর বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারগুলো আর্থিক অনটনে পড়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এই চেতনা ব্যবসায়ীরা যুগে যুগে থাকবেই। আর বিপদ দেখলে খাটের তলায় লুকাবে, আর বিপদ কেটে গেলে চেতনা বাস্তবায়ন করবে। এই চেতনা ব্যবসায়ীদের চরিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়—
“ওরা মরিবে না, যুদ্ধ বাঁধিলে ওরা লুকাইবে কচুবনে,
দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে।”