উপেনের শুধু দুই বিঘে জমি ছিল, আর যা ছিল, সবই ঋণের দায়ে বিক্রি করতে হয়েছে। এক দিন বাবু (জমিদার) বললেন,
“বুঝছ, উপেন? এ জমি আমি কিনে নেব।”
উপেন বলল,
“তুমি ভূস্বামী, তোমার ভূমির শেষ নেই। চেয়ে দেখো, আমার আছে বড়জোর এই দুই বিঘে জমি, আর তো কিছুই নেই।”
সব শুনে বাবু (জমিদার) বললেন,
“জানোত, উপেন, করেছি একটা বাগান। যদি দুই বিঘে জমি পাই, তাহলে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সমান হবে, তাই জমি দিতে হবে।”
উপেন জমিদারের পায়ে পড়ে বলল,
“রক্ষা করুন এই গরিবের ভিটেখানি। যে জমিতে আমার সাত পুরুষ বাস করেছে, চাষ করেছে—সে মাটি সোনার চেয়েও দামী। দারিদ্র্যের চাপে যদি সেই মাটি বিক্রি করতে হয়, তবে তা আমার কাছে চরম দুর্ভাগ্য ও অভিশাপের মতো।”
চোখ লাল করে, করুণাহীন হাসি দিয়ে জমিদার বলল,
“আচ্ছা, তা দেখা যাবে।”
পরে মাস-দেড়ে পর উপেন ভিটে-মাটি ছেড়ে বের হয় পথে। জমিদারের করা মিথ্যা ঋণের মামলায় ভিটে-মাটি সব যায় উপেনের।
উপেন মনে মনে ভাবল,
“সৃষ্টিকর্তা মনে হয় আমাকে এই মোহের গর্তে রাখতে চায় না, তাই দুই বিঘা জমির পরিবর্তে আমাকে লিখে দিয়েছেন এই বিশ্বনিখিল।”
এরপর উপেন সন্ন্যাসীবেশে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। আবার হয় অনেক সাধুর শিষ্য। সে দেখল কত সুন্দর স্থান, কত মোহনীয় দৃশ্য—প্রকৃতি, মানুষ আর সভ্যতার নানা রূপ। পাহাড়, সাগর, নির্জন প্রান্তর, আবার জনবহুল শহর, আরও কত কি!
তাও কখনো উপেন ভুলতে পারল না তাঁর সেই দুই দিঘে জমি। এভাবে হাটে-মাঠে-বাটে কাটে পনেরো-ষোলো বছর।
এরপর একদিন দেশে ফেরার বড় ইচ্ছে হল উপেনের। দুই দিন পরে, দ্বিতীয় প্রহরে, নিজ গ্রামে প্রবেশ করে উপেন। দীর্ঘ পথপেরিয়ে, নানা দৃশ্য উপভোগ করে উপেন অবশেষে নিজের বাড়ির কাছে পৌঁছায়।
বিদীর্ণ হয়ে চারপাশে চেয়ে চেয়ে দেখছিল উপেন। হঠাৎ তার চোখে পরে প্রাচীরের ধারে থাকা তার আমলের সেই আম গাছটা। তখন সেই আম গাছের নিচে বসে পড়ে উপেন। বসার পর তার নয়নের জলে শান্ত হয় তাঁর ব্যথা।
তখন তার মনে পড়ে তাঁর বাল্যকালের কথা। মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে ঘুম হয়নি, অতি ভোরে তাড়াতাড়ি উঠে আম কুড়াবার জন্য ছুটে যাওয়া। মনে পড়ে সেই স্তব্ধ দুপুরে পাঠশালা পলায়ন। উপেন ভাবল,
“আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন।”
এমন সময় সহসা বাতাস এসে দুলিয়ে দেয় গাছের ডাল, আর দুটি পাকা আম এসে পড়ে উপেনের কোলের কাছে।
উপেন ভাবল,
“সম্ভবত এতদিন পরে মাতৃভূমি আমাকে চিনেছে, তাই মাতৃভূমি তার প্রতি স্নেহ দেখিয়ে।”
তাই আম দুটি হাতে তুলে নিল উপেন। কিন্তু তখনই কোথা থেকে যেন যমদূত হয়ে এল মালী। ঝুঁটি ধরে মালী উপেনকে গালি দিতে লাগল।
উপেন বলল,
“আমি তো নীরবে আমার সব দিয়েছি। আমি শুধু দুইটা আম নিয়েছি, তাই এত কিছু।”
তবুও উপেনকে চিনল না মালি। তাকে ধরে নিয়ে জমিদারের কাছে নিয়ে যায়। জমিদার তখন তাঁর পারিষদসহ মাছ ধরছিলেন। শুনে জমিদার রেগে লাল হয়ে যায়। আর জমিদার যা বলেন, পারিষদ দল তা শতগুণ বৃদ্ধি করে বলে।
উপেন বলল,
“আমি শুধু আপনার কাছে এই দুইটা আম ভিক্ষা চাই।”
জমিদার হেসে বলল,
“বেটা, তুই সাধুবেশে পাকা এক চোর!”
দুঃখজনক সত্য হলো, এই পৃথিবীতে যাদের আছে অঢেল সম্পদ, তারাই আরও বেশি চায়। অভাবী মানুষ নয়, বরং ধনীর লোভই সীমাহীন। ক্ষমতাবানরা নিজেদের শক্তি ও আইন ব্যবহার করে গরিবের সামান্য সম্পদও কেড়ে নেয়। এটি সরাসরি চুরি না হলেও, শোষণের মাধ্যমেই সেই চুরি ঘটে।
“এই লেখাটি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা, যে টিকে আমি রূপান্তরিত করে গল্পে রুপ দিয়েছি এবং কিছু আবার আমিও যোগ করেছি। এক কথায় ৫০% আমার ব্যক্তিগত লেখা আর বাকি ৫০% কবিতা থেকে রূপান্তরিত করা”