যুদ্ধটা বড়াইবাড়িতে হলেও ঘটনার শুরু সিলেটের পাদুয়া থেকে। সিলেটের পাদুয়াতে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে দীর্ঘদিন অবৈধভাবে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প করে রেখেছিল বিএসএফ। তবে এ নিয়ে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে কোনো উত্তেজনা ছিল না। ২০০১ সালে বিএসএফ পাশের আরেকটি ক্যাম্পের সঙ্গে একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ শুরু করে বাংলাদেশ সীমান্তের ওপর দিয়েই। এমন অবস্থায় বিডিআরও একই জায়গায় একটি অপারেশনাল ক্যাম্প স্থাপন করে।
বিডিআর সড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি জানালেও বিএসএফ তাতে কর্ণপাত করেনি, উল্টো বিডিআরের অপারেশনাল ক্যাম্পে ৬ রাউন্ড গুলি করে। জবাবে বিডিআর বিএসএফের ক্যাম্পটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এতে ৭০ জন বিএসএফ সদস্য নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে ভারতে ফিরে যায়। আর এই লজ্জাজনক ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পনা শুরু করে বিএসএফ। তারা কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্প দখলে নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
১৮ই এপ্রিল ২০০১। তখন সুবহে সাদিক। একটু পরই সূর্য উঠবে পূর্বাকাশে। আর সেই ভোর ফোটার আগে, হালকা কুয়াশা ঢাকা মাঠের ভেতর দিয়ে কয়েকজন কৃষক তাদের ধানক্ষেতে যাচ্ছিলেন সেচব্যবস্থা দেখতে। অন্যান্য দিনের মতো এটাও ছিল খুবই স্বাভাবিক একটি কাজ। কিন্তু আজ হঠাৎই তারা থমকে দাঁড়ায়। তারা দেখতে পান, ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে বহু সৈন্য অস্ত্র নিয়ে হাঁটছে। কিন্তু তখনো কৃষকেরা বুঝে উঠতে পারেননি, এরা কারা। এবার কিছু সৈন্য সামনে এগিয়ে এসে কড়া হিন্দি উচ্চারণে জানতে চায়— “বিডিআর ক্যাম্প কোথায়?” এবার শিউরে ওঠেন কৃষকেরা। তারা বুঝতে পারেন, এরাই সেই নির্মম বিএসএফ—ভারতের এক নৃশংস সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
কৃষকদের একজন, সাইফুল ইসলাম, বুদ্ধি করে তাদের ভুল ঠিকানা দেন এবং বিএসএফ সে দিকেই রওনা হয়। আর এদিকে বিএসএফকে ভুল ঠিকানায় পাঠিয়ে সাইফুল ইসলাম ছুটে আসেন বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে। সে সময়ে ক্যাম্পে ছিলেন মাত্র ৮ জন বিডিআর সদস্য। তারা এই খবর পাওয়ার পর দ্রুত গ্রামবাসীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেন এবং নিজেরা ক্যাম্প ফাঁকা রেখে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে পজিশন নেন। কৃষক সাইফুল ইসলাম নিজেও আনসারের ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি সহ আনসারের ট্রেনিংপ্রাপ্ত গ্রামের আরও কয়েকজন যুবক অস্ত্র হাতে নেন বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে।
একদল ভারী অস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনীকে পদানত করতে সেদিন জীবন বাজি রেখেছিল ৮ জন বিডিআর সদস্য আর সাহসী একদল গ্রামবাসী। আর এদিকে হানাদার বিএসএফ সদস্যরা ভুল ঠিকানা থেকে আবার গ্রামের দিকে ফিরে আসে এবং বিডিআর ক্যাম্পটি খুঁজে পায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্যাম্প লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। বিএসএফের ভারী অস্ত্রের গুলিতে কেঁপে ওঠে পুরো সীমান্ত। কিছুক্ষণ গুলি ছোড়ার পর তারা ভাবে, হয়তো বিডিআর সদস্যরা ভয়ে ক্যাম্প ফাঁকা রেখে পালিয়ে গেছেন।
এমন সময় হঠাৎ বিএসএফ সদস্যদের মাঝে রেখে চারদিক থেকে গুলি করা শুরু করেন ৮ জন বিডিআর সদস্য এবং আনসারের ট্রেনিংপ্রাপ্ত আরও ১২ জন। সদরদপ্তরে খবর পৌঁছালে ময়মনসিংহ ও জামালপুর থেকেও বিডিআর সদস্যরা বড়াইবাড়িতে এসে পৌঁছান। এবার পুরোপুরি পাল্টে যায় দাবার ঘুঁটি। এবার বিএসএফ নিজেরাই আটকা পড়ে ফাটা বাঁশের চিপায়। হঠাৎ আক্রমণ করতে আসা বিএসএফ এবার নিজেরাই বিডিআর সদস্যদের পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়।
১৮ এপ্রিল সারাদিন, সারা রাত এবং ১৯ এপ্রিল সারা রাত গোলাগুলি চলে। চতুর্মুখী আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে বিএসএফ একসময় ১৬ জন সৈন্যকে বাংলাদেশের ভেতরে ধানক্ষেতে ফেলে কাপুরুষের মতো পালিয়ে যায়। আর বিএসএফের ১৬ জনের বিপরীতে এই যুদ্ধে ২ জন বিডিআর সদস্য মৃত্যুবরণ করেন।
তবে গ্রামবাসী বিএসএফের এই নির্মম আক্রমণের জবাব দেন আরও অভিনবভাবে—তারা একজন বিএসএফ সদস্যের মরদেহ বাঁশে ঝুলিয়ে কাঁধে করে নিয়ে যান। কারণ এই বিএসএফরা এই আক্রমণে মর্টার শেল ব্যবহার করে প্রায় ১৭৯টি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। সুতরাং তাদের এই ক্ষোভ স্বাভাবিক। আর এর কারণে ভারত সরকার দেশের ভেতরে প্রবল চাপে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে—টাকা দিয়ে পালা একদল কাপুরুষদের প্রতি। যদিও বাংলাদেশের নিকট ভারতের এই পরাজয় নতুন না। ইতিপূর্বে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ও পূর্ব পাকিস্তানের সৈন্যরা তথা ইপিআর ভারতকে সমুচিত জবাব দিয়েছিল।
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এই পরাজয় ছিল বিশাল একটি সফলতা ও জবাব। কারণ এই পরাজয়ের ধাক্কায় ভারত সরকার চাপে পড়ে। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার এই বিজয়কে গৌরব হিসেবে না দেখে অস্বস্তির বিষয় বলে পাশ কাটিয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় বিডিআর দুর্বল করার পরিকল্পনা, যার পরিণতি আমরা ভয়াবহভাবে দেখেছি ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডিতে।
কিন্তু তাদের এই বীরত্বের পরেও তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক ফজলুর রহমানকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনা হয়। যেখানে সীমান্তের এই বীরোচিত অবদানের জন্য তাঁর ও বাহিনীর রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে তিনি পেলেন তিরস্কার। যদিও মেজর জেনারেল ফজলুর রহমান এ ঘটনাকে ভুল বা দায় এড়িয়ে না গিয়ে সরাসরি বলেন—
“আপনারাই বিচার করুন। বর্ডারে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বেই আমাকে নিয়োজিত করা হয়েছে। আমি যদি ওই সময়ে আপোষ করতাম, তাহলে এই সমালোচনা আমাকে শুনতে হতো না। আমার তো কাজই হলো সীমান্ত রক্ষা করা এবং সীমান্তের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া।”
এই ঘটনার পর শহীদ বিডিআর সদস্যদের স্মরণে নির্মিত হয় দায়সারা গোছের স্মৃতিস্তম্ভ। বীরোচিত এই বিজয়কে নানাভাবে মুছে ফেলার অপচেষ্টা চালানো হয়। যার অন্যতম নজির বিডিআর বিদ্রোহের নাটক করে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়া। যার ফলশ্রুতিতে জীবন যায় অজস্র ফেলানীর।
সীমান্তে জাতীয় নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন সুরক্ষায় সরকারের আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া জরুরি, যাতে আর কখনো বিএসএফ সীমান্তের এক ইঞ্চি ভেতরে পা ফেলতে সাহস না পায়।
বড়াইবাড়ির সেই রক্তাক্ত দিন কেবলমাত্র একটি দিনের ইতিহাস নয়; এটি আমাদের এই ভূমির স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণ। তবে এখনো একটি প্রশ্ন বারবার মনে জাগে—আমরা কি আজও সীমান্তে নিরাপদ? আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতি কতটা প্রস্তুত সেই নিরাপত্তা নিশ্চিতের জবাব দিতে? এবং কবে বিচার হবে অজস্র ফেলানী হত্যার?